

মানুষ জন্মগ্রহণ করে, বড় হয়, জীবিকার সন্ধানে ছুটে চলে, সংসার গড়ে, সম্পর্ক তৈরি করে, স্বপ্ন দেখে, ব্যর্থ হয়, আবার উঠে দাঁড়ায়। এভাবেই কেটে যায় জীবনের দীর্ঘ পথ। কিন্তু এই চলার নামই কি জীবন? নাকি জীবনকে উপলব্ধি করা, প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের স্বকীয়তা ধরে রাখা, সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করা এবং সীমিত সময়ের মধ্যে অর্থবহ কিছু সৃষ্টি করার নামই প্রকৃত জীবন?
প্রশ্নটি আমাদের গভীরভাবে ভাবতে শেখায়—জীবনটাও কি একটি শিল্প ? আমার বিবেচনায়, জীবন শুধু একটি শিল্পই নয়; এটি এমন এক শিল্প, যার ক্যানভাস আমাদের প্রতিদিনের সময়, রং আমাদের চিন্তা ও অনুভূতি, তুলির আঁচড় আমাদের সিদ্ধান্ত, আর চূড়ান্ত চিত্রটি আমাদের চরিত্র ও কর্মের প্রতিফলন। তবে এই শিল্পের সৌন্দর্য নির্ভর করে না শুধু কে কত সম্পদ অর্জন করল, কে কত বড় পদে পৌঁছাল কিংবা কে কত মানুষের কাছে জনপ্রিয় হলো তার ওপর। বরং নির্ভর করে—একজন মানুষ কতটা মানবিক হতে পারল, কতটা ন্যায়নিষ্ঠ থাকল এবং অন্যের জীবনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব রেখে গেল তার ওপর।
একজন চিত্রশিল্পী যেমন রং, রেখা ও কল্পনার সমন্বয়ে একটি ছবি তৈরি করেন, তেমনি মানুষও প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্ত, অভ্যাস ও মূল্যবোধ দিয়ে নিজের জীবনকে নির্মাণ করে। এখানে পার্থক্য হলো, চিত্রশিল্পী একটি ছবি এঁকে সেটি সংশোধন করতে পারেন; কিন্তু জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ফিরে পাওয়া যায় না। বলা যায়, সময়ই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কাঁচামাল—একবার ব্যয় হয়ে গেলে তা আর ফেরত আসে না। তবে জীবনের সব পরিস্থিতি মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কেউ জন্ম থেকেই আর্থিক স্বচ্ছলতা পায়, কেউ দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে। কেউ সুস্থ শরীর নিয়ে পথচলা শুরু করে, কেউ অসুস্থতা বা প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালায়। কারও সামনে সুযোগের দরজা সহজে খুলে যায়, কারও জন্য প্রতিটি পদক্ষেপই কঠিন হয়ে ওঠে।
জীবনের শিল্প তাই নিখুঁত হওয়ার প্রতিযোগিতা নয়; বরং ভুল থেকে শেখা, প্রয়োজন হলে পথ পরিবর্তন করা এবং নিজের মানবিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাধনা। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সামনে এক ধরনের কৃত্রিম সাফল্যের প্রদর্শনী তুলে ধরছে। কে কোথায় ভ্রমণ করলেন, কার কত দামি গাড়ি, কার কত অনুসারী, কে কত বড় পদে আসীন—এসব দৃশ্য দেখে অনেকে নিজের জীবনকে অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা করেন। ফলে নিজের অর্জনও কখনো কখনো তুচ্ছ মনে হয়।
অথচ আমরা অন্যের জীবনের দৃশ্যমান অংশ দেখি, কিন্তু তার দুশ্চিন্তা, পারিবারিক সংকট, একাকিত্ব কিংবা ব্যক্তিগত সংগ্রাম সম্পর্কে কিছুই জানি না। এভাবে তুলনা করতে করতে মানুষ নিজের জীবনের সৌন্দর্য উপলব্ধি করার ক্ষমতা হারাতে পারে। অন্যের সাফল্যকে নিজের ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখা শুরু করে। কিন্তু জীবনশিল্পের মূল কথা হলো, অন্যের ক্যানভাস দেখে নিজের ছবির মূল্য নির্ধারণ না করা। প্রত্যেক মানুষের পরিস্থিতি, সুযোগ, সামর্থ্য ও দায়িত্ব আলাদা। তাই সবার সাফল্যের মাপকাঠিও এক হতে পারে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসিক সুস্থতা মানুষকে জীবনের চাপ মোকাবিলা করতে, নিজের সক্ষমতা উপলব্ধি করতে, শেখা ও কাজ করতে এবং সমাজে অবদান রাখতে সহায়তা করে। মানসিক সুস্থতা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ, অর্থনৈতিক অবস্থা ও পরিবেশের মতো বিভিন্ন উপাদানের দ্বারা প্রভাবিত হয়। [৪] অতএব, মানসিক শান্তির জন্য শুধু ইতিবাচক চিন্তা করলেই হবে না; প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ, সহায়ক সম্পর্ক, বিশ্রাম, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সামাজিক সহযোগিতাও। সব দুঃখের দায় ব্যক্তির মানসিক দুর্বলতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি নিজের সাধ্যের মধ্যে ভালো অভ্যাস গড়ে তোলার গুরুত্ব অস্বীকার করাও ভুল। মানুষ একা জন্মগ্রহণ না করলেও জীবনের বহু সিদ্ধান্ত তাকে একাই নিতে হয়। সেই সিদ্ধান্তের পথে পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী ও সমাজের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তাকে শক্তি জোগায়। আবার অবহেলা, অহংকার, স্বার্থপরতা ও অবিশ্বাস সম্পর্ককে ভেঙেও দিতে পারে।
একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে সময় লাগে, কিন্তু একটি অসতর্ক বাক্য, প্রতারণা কিংবা দীর্ঘদিনের অবহেলা সেই সম্পর্ককে গভীরভাবে আহত করতে পারে। তাই কথা বলার আগে ভাবা, অন্যের বক্তব্য শোনা, ভুল বোঝাবুঝি দূর করা এবং প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো—এসবও জীবনের শিল্পের অংশ। তবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার নামে আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়াও সমাধান নয়। সব সম্পর্ক সমানভাবে সুস্থ থাকে না। কোথাও সীমারেখা টানা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা কিংবা ক্ষতিকর সম্পর্ক থেকে সরে আসাও প্রয়োজন হতে পারে। প্রকৃত সম্পর্কের সৌন্দর্য নির্ভর করে পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস ও দায়িত্ববোধের ওপর; একতরফা ত্যাগের ওপর নয়। জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হলে সময়ের মূল্য বুঝতে হবে। কিন্তু সময় ব্যবস্থাপনা মানে প্রতিটি মুহূর্তকে কাজের চাপে ভরে ফেলা নয়। কাজের পাশাপাশি পরিবার, বিশ্রাম, আত্মসমালোচনা, জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার জন্যও সময় রাখা প্রয়োজন। একজন মানুষ সারাজীবন শুধু অর্থ উপার্জন করলেন, কিন্তু সন্তানদের সঙ্গে অর্থবহ সময় কাটাতে পারলেন না; নিজের শরীর ও মনের যত্ন নিলেন না; অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মুখ ফিরিয়ে রইলেন—তাহলে তার অর্জনের হিসাব সম্পূর্ণ হলো কি? অন্যদিকে, দায়িত্ব এড়িয়ে শুধু নিজের আনন্দের পেছনে ছুটলেও জীবন সুন্দর হয় না। পরিবারের প্রতি দায়িত্ব, পেশাগত সততা, সামাজিক কর্তব্য এবং ব্যক্তিগত বিকাশ—সবকিছুর মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
এখানে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বও রয়েছে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা এবং মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসার অভাব মানুষের জীবন গঠনের সুযোগ সীমিত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা ও বিশ্লেষণও দেখায়, মানুষের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই প্রত্যেক মানুষকে নিজের জীবন সুন্দর করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি এমন সমাজ গড়ে তোলাও জরুরি, যেখানে মানুষ সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পায় এবং নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ লাভ করে। জীবনকে শিল্প হিসেবে দেখতে চাইলে কয়েকটি প্রশ্ন প্রতিদিন নিজেকে করা যেতে পারে। আজ আমি কি কাউকে অকারণে কষ্ট দিয়েছি? নিজের দায়িত্ব কতটা পালন করেছি? কোনো ভুল থেকে কি শিক্ষা নিয়েছি? আমার সাফল্যে অন্য কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে কি? যাদের ভালোবাসি, তাদের জন্য যথেষ্ট সময় রেখেছি কি? আমার অনুপস্থিতিতে মানুষ আমাকে শুধু আমার পদবি ও সম্পদের জন্য স্মরণ করবে, নাকি আমার আচরণ ও অবদানের জন্যও মনে রাখবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সব সময় স্বস্তিদায়ক হবে না। কিন্তু আত্মসমালোচনার সাহসই মানুষকে পরিণত করে। যে নিজের ভুল দেখতে শেখে, সে সংশোধনের পথও খুঁজে পায়। জীবনের সৌন্দর্য বড় কোনো ঘটনার অপেক্ষায় থাকে না। কখনো তা একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোয়, কখনো পরিবারের কারও কথা মন দিয়ে শোনায়, কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণে, আবার কখনো নিজের অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেও প্রকাশ পায়। আমরা সবাই বড় কোনো কীর্তি গড়তে পারব না, বিখ্যাত হতে পারব না, ইতিহাসের পাতায় নামও লিখতে পারব না।
কিন্তু প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক হওয়ার চেষ্টা করতে পারি। আর সেই চেষ্টাই জীবনকে অর্থবহ করে তোলার অন্যতম ভিত্তি। জীবনকে শিল্প বলা যায়—তবে এটি কেবল সুন্দর মুহূর্তের শিল্প নয়; এর মধ্যে কান্না আছে, ক্ষত আছে, অপূর্ণতা আছে, হারানোর বেদনা আছে, আবার নতুন করে শুরু করার সাহসও আছে। জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আনন্দের হবে না, প্রতিটি সিদ্ধান্ত সফল হবে না, প্রতিটি সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে না। তারপরও মানুষ তার অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারে, নিজের ভুল সংশোধন করতে পারে এবং অন্যের প্রতি মানবিক থাকতে পারে। একটি সুন্দর জীবনের সংজ্ঞা তাই শুধু দীর্ঘায়ু, বিপুল সম্পদ কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠা দিয়ে নির্ধারিত হয় না।
বরং মানুষ কতটা সততার সঙ্গে বেঁচেছে, কতটা দায়িত্ব পালন করেছে, কতটা ভালোবাসা দিতে পেরেছে এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পৃথিবীকে কতটা সুন্দর করার চেষ্টা করেছে—সেই প্রশ্নগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জীবন আমাদের হাতে দেওয়া একটি অসমাপ্ত শিল্পকর্ম। সময় তার ক্যানভাস, সিদ্ধান্ত তার রং, চরিত্র তার নকশা, আর মানবিকতা তার সৌন্দর্য। শেষ পর্যন্ত আমরা কী রেখে যাব—সম্পদের পাহাড়, পরিচিতির অহংকার, নাকি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকার মতো কিছু স্মৃতি ও অবদান? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে, আমরা শুধু জীবন কাটিয়েছি, নাকি সত্যিই জীবনকে একটি শিল্পে রূপ দিতে পেরেছি।
— এস এম আওলাদ হোসেন সাংবাদিক ও কলামিস্ট
