

মো. নজরুল ইসলাম।।
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলা—ঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর লবণাক্ততার সাথে লড়াই করা এক জনপদ।
এই প্রতিকূল ভূখণ্ডে একদিকে রয়েছে জীবনের চরম নির্মমতা, অন্য দিকে রয়েছে শত প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো অদম্য নারীদের গল্প।
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকালে বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা বারসিক-এর উদ্যোগে মানিকগঞ্জের সমতলের একদল উন্নয়নকর্মী শ্যামনগরের বিভিন্ন গ্রাম সরজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে তুলে এনেছেন এই জীবনসংগ্রামের নানা রূপ।
কৃষিপ্রতিবেশ ও নতুন স্বপ্নের সূচনা
ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের তেরকাঠির চক ধুমঘাট গ্রামে আল্পনা রানী মিস্তি ও তাঁর স্বামী গঙ্গাধর মিস্তিরির বিষমুক্ত কৃষি খামার যেন এক পরিবেশবান্ধব পরিবর্তনের প্রতীক।
তারা দেশীয় জাতের বীজ, সবজি, মাছ চাষের পাশাপাশি কেঁচো সার তৈরি করছেন। আল্পনা রানীর নেতৃত্বে ‘শাপলা নারী উন্নয়ন কমিটি’ কেবল গৃহস্থালি কৃষি চর্চাতেই সীমাবদ্ধ নয়, সামাজিক ব্যাধি দূর করতেও কাজ করছে। সাম্প্রতিককালে কিশোরী দিপীকা রানীর বাল্যবিয়েকে ‘না’ বলার সাহসী উদ্যোগ তাঁদের সামাজিক চেতনারই এক অনন্য উদাহরণ।
একই সাথে পরিবারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়িয়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে অবদান রাখছেন আল্পনা রানীর ছেলের বৌ লিলি রানী মিস্তি।
একই গ্রামের গোবিন্দ মন্ডলের এগ্রোইকলোজি লার্নিং সেন্টার (এএলসি)-তে বস্তায় আদা চাষ, মিষ্টি আনারস ও জাম্বুরাসহ বিশাল এলাকা জুড়ে জৈব কৃষির উজ্জ্বল নিদর্শন দেখা যায়।
আর বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের পানখালি গ্রামের কনিকা মন্ডলের এএলসি সেন্টারটি যেন একেবারে এক ‘ওষুধী বাড়ি’—যেখানে নিমপাতা, আমলকী ও পাথরকুচির মতো ঔষধি গাছের ভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়েছে।
আরও উল্লেখ্য যে সমাজের অবহেলা আর ‘বাঘ বিধবা’র করুণ উপাখ্যান
সাফল্যের এই উজ্জ্বল আলোর পাশেই রয়েছে উপকূলীয় নারীদের বৈষম্য, অবহেলা ও সামাজিক কুসংস্কারের অন্ধকার দিক। সুন্দরবন সংলগ্ন এই অঞ্চলে দুর্যোগ ও দারিদ্র্যের কারণে পুরুষেরা যখন নিখোঁজ হন বা মারা যান, তখন অনিচ্ছাসত্ত্বেও পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে নারীর কাঁধে।
শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ বাজারের পেছনে জেলেপাড়ার ষাটোর্ধ্ব সোনোমনি তেমনই এক ভাগ্যবিড়ম্বিত ‘বাঘ বিধবা’। ১৯৯৯ সালে সুন্দরবনে মাছ শিকারে গিয়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান তাঁর প্রথম স্বামী। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ ও শাশুড়ি সোনোমনিকে ‘অপয়া’ আখ্যা দিয়ে মাত্র এক মাসের শিশুসহ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে দেবরের সাথে বিয়ে হলেও ২০০২ সালে দ্বিতীয় স্বামীও বাঘের পেটে যান। সমাজ তাঁকে উপাধি দেয় ‘স্বামীখেকো’। সকালে তাঁর মুখ দেখলে নাকি বিপদ হবে—এই ভেবে শাশুড়ি তাঁকে শেকল দিয়ে পর্যন্ত বেঁধে রাখতেন।
বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় স্বামীর চার সন্তান থাকলেও কেউ তাঁর খবর নেয় না। জীবনধারণের জন্য তিনি এখন একাকী হাটে-বাজারে দোকান ঝাড়ু দেন, নদীতে জাল টেনে মাছ-কাঁকড়া ধরেন এবং ঘেরে মাটি কাটার কাজ করেন। সামাজিক সুরক্ষাবলয়ের বাইরে থাকা এই প্রবীণ নারীর আক্ষেপ—জনপ্রতিনিধিরা তাঁর খবর রাখেন না।
স্বাবলম্বী হওয়ার অদম্য লড়াই: শেফালী বিবির সাফল্য
সমস্ত বাঁধাকে জয় করে স্বাবলম্বী হওয়ার অনুপ্রেরণাদায়ী উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন দাতিনাখালী গ্রামের শেফালী বিবি (৫৫)। সুন্দরবন থেকে সংগৃহীত কাঁচামালকে কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের ভাগ্য। বারসিক-এর পরামর্শ ও সহায়তায় তিনি সুন্দরবনের ফল ‘কেওড়া’ দিয়ে টক, ঝাল ও মিষ্টি আচার, জেলি এবং চকোলেট তৈরি শুরু করেন। পাশাপাশি মোম দিয়ে শোপিস ও মোমবাতি বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে তিনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
শেফালী বিবি নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি উপকূলের অন্যান্য বননির্ভর নারীদের সংগঠিত করতে গড়ে তুলেছেন ‘দাতিনাখালী বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠন’। শতাধিক নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি আত্মনির্ভরশীল করে তুলেছেন। এই নারীদের তৈরি পণ্যের লভ্যাংশের একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে এলাকার 'বাঘ বিধবা' ও সহায়সম্বলহীন বনজীবী নারীদের কল্যাণে।
শেষকথা
উপকূলীয় অঞ্চলে বারসিক-এর মতো সংস্থার উদ্যোগের মাধ্যমে এখানকার নারীরা পানি কমিটি, ভূমি কমিটি, জলবায়ু পরিষদ ও মহিলা ক্রীড়া সংস্থার মতো বিভিন্ন ফোরামে যুক্ত হয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতন হচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম শিকার এই উপকূলের নারীরা একদিকে যেমন চরম সামাজিক কুসংস্কার ও জীবনসংগ্রামের মুখোমুখি, তেমনি অন্যদিকে নিজেদের মেধা ও শ্রম দিয়ে রচনা করছেন ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন নতুন ইতিহাস।
পরিদর্শনী টিমে
মানিকগঞ্জ সমতল থেকে রাশেদা আক্তার, মো. নজরুল ইসলাম, রিনা সিকদার, আছিয়া আক্তার, নিতাই চন্দ্র দাস ও তপন সাহা।
বারসিক শ্যামনগর আঞ্চলিক টিমে শাহীন ইসলাম (আঞ্চলিক সমন্বয়কারী), রামকৃষ্ণ জোয়ার্দার (সহকারী আঞ্চলিক সমন্বয়কারী), মো. মফিজুর রহমান, মনিকা দাস ও ওসমান গনি প্রমুখ।
