

এস এম আওলাদ হোসেন, সিনিয়র রিপোর্টার।।
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে শাহনাজ(২০) নামে এক প্রসূতিকে দীর্ঘক্ষণ আটকে রেখে অপ-চিকিৎসা দিয়ে গর্ভস্থ নবজাতককে মেরে ফেলার অভিযোগ উঠেছে ‘লাইফ লাইন’ নামে একটি বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে। বৈধ চিকিৎসক ছাড়াই প্রসূতির শরীরে একের পর এক ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়। এতে গর্ভেই নবজাতকের মৃত্যু হলে পরবর্তীতে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মৃত সন্তান বের করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে উপজেলার করইতলা বাজারের লাইফ লাইন হসপিটালে মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ভুক্তভোগীর স্বজনেরা হাসপাতালে জড়ো হয়। এসময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে স্বজনদের তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে লরেন্স ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতিসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, বিয়ের পর প্রথম সন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন শাহনাজ ও আরিফ দম্পতি। গত মঙ্গলবার রাতে শাহনাজের প্রসববেদনা উঠলে নরমাল ডেলিভারির আশ্বাসে তাকে উক্ত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বাভাবিক প্রসবের কোন খবর দিতে পারেনি চিকিৎসা দেওয়া ডা.সুমনা।রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি বুঝতে পেরে স্বজনেরা উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদরে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বারবার ছাড়পত্রের (রিলিজ) আকুতি জানান। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছাড়পত্র না দিয়ে উল্টো রোগীকে আটকে রেখে একের পর এক ইনজেকশন দিতে থাকে। একপর্যায়ে গর্ভেই নবজাতকের মৃত্যু হলে তড়িঘড়ি করে অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়াই অস্ত্রোপচার (ছোট সিজার) করা হয়।
কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রসূতির স্বামী আরিফ বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসক না বললেও আমরা বিপদ বুঝতে পেরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বারবার রিলিজ চেয়েও পাইনি। চিকিৎসক সুমনা আমাদের কথা না শুনে উল্টো ধমক দেন এবং নরমাল ডেলিভারির আশ্বাস দিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘ছোট সিজার’ লাগবে। পরবর্তীতে ছোট সিজার করার পর জানান, ‘বাচ্চা নিচে নেমে গেছে, ছোট সিজারে হবে না’। এভাবে অপচিকিৎসা দিয়ে তারা আমার বাচ্চাটাকে মেরে ফেলেছে এবং স্ত্রীর অবস্থাও আশঙ্কাজনক করে তুলেছে। আমরা এই ভুয়া ডাক্তার সুমনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিমালা তোয়াক্কা না করে এমবিবিএস ডাক্তার ছাড়াই চলছে ‘লাইফ লাইন’ হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম। প্রসূতি চিকিৎসা ও আলট্রাসনোগ্রাফির কোনো বৈধ অনুমোদন না থাকলেও সুমাইয়া ইসলাম সুমনা নামের এক ডিএমএফ (DMF) সনদধারী চিকিৎসা সহকারীকে দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।এর ফলে এর আগেও উক্ত হাসপাতালে একাধিক নবজাতকের মৃত্যু এবং প্রসূতিরা ভয়াবহ ইনফেকশন ও নানা শারীরিক জটিলতায় পড়েছেন বলে ভুক্তভোগীদের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ‘লাইফ লাইন প্রাইভেট হাসপাতাল’-এর পরিচালক মিজানুর রহমানের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, ঘটনার পর কাছের মানুষেরা বেঈমানি, বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্র করছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, “লাইফ লাইন হাসপাতালের সুমনা নামে যিনি আছেন, তার প্রসূতির চিকিৎসা কিংবা আলট্রাসনোগ্রাফি করার কোনো এখতিয়ার নেই। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুরের সিভিল সার্জন ডা. বাহারুল আলম বলেন, চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।
