ঢাকা
৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ৯:৫১
প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
আপডেট: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬

ইটের খাঁজে ইতিহাস ও লোককথা: লক্ষ্মীপুরের প্রাচীন তিতাখাঁ ও আজিম শাহ জামে মসজিদ

এস এম আওলাদ হোসেন, সিনিয়র রিপোর্টার।।

লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেমুহনী থেকে দক্ষিণে চকবাজার সড়কের বাঞ্চানগর এলাকায় পাশাপাশি অবস্থান করছে জেলার ঐতিহাসিক দুটি প্রাচীন মসজিদ—তিতাখাঁ জামে মসজিদ ও হজরত আজিম শাহ (রহ.) জামে মসজিদ, যা স্থানীয়ভাবে তিতাখাঁ বা ডায়রা মসজিদ নামেও পরিচিত। একসময় ঘন জঙ্গল ও দুর্গম পথঘেরা এ এলাকায় আজ জনবসতি গড়ে উঠলেও শত বছরের পুরনো স্থাপনাগুলো এখনো অতীত ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তিতাখাঁ মসজিদের সঠিক নির্মাণকাল নিয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া না গেলেও স্থানীয়দের ধারণা, মসজিদটি মোগল আমলে—প্রায় পাঁচশ বছর আগে—নির্মিত।

মসজিদটি প্রায় ৪৯ ফুট লম্বা ও ৪২ ফুট প্রশস্ত। ইট, চুন ও সুরকি দিয়ে নির্মিত একতলা স্থাপনাটির চার কোণে রয়েছে চারটি ছোট মিনার এবং উপরে তিনটি বড় গম্বুজ। দেয়ালে লতাপাতা ও বিভিন্ন শৈল্পিক নকশার পাশাপাশি ভাঙা সিরামিকের টুকরো ব্যবহারের রয়েছে। প্রাচীন নির্মাণপদ্ধতিতে কাঠের কাঠামোর ওপর ইট বসিয়ে চুন-সুরকির প্রলেপ দিয়ে ছাদ নির্মাণ করা হয়েছিল।

সময় গড়ানোর সঙ্গে মসজিদটিতে সংস্কার হয়েছে। ফলে কিছু পুরনো নকশায় পরিবর্তন এলেও মূল স্থাপনাটি এখনো ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে টিকে আছে। একসঙ্গে ৫০০-এর বেশি মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রশাসনের পর্যটন তথ্যভাণ্ডারে তিতাখাঁ মসজিদকে প্রায় ৩০০ বছর পুরনো বলা হয়েছে; জেলা প্রশাসনের আরেক তথ্যসূত্রে আবার এটিকে দুই শত বছরের অধিক প্রাচীন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মসজিদের প্রকৃত নির্মাণকাল নির্ধারণে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণা প্রয়োজন।

তিতাখাঁ মসজিদ থেকে প্রায় ৫০ মিটার উত্তরে অবস্থিত হজরত আজিম শাহ (রহ.) জামে মসজিদ। এ মসজিদকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা ও আধ্যাত্মিক কাহিনি।
প্রতিবেদনে প্রচলিত একটি বর্ণনা অনুযায়ী, ১৭৮৫ সালে ইয়েমেন থেকে পীর দায়েম শাহের নির্দেশে ২৬ বছর বয়সে আজিম শাহ (রহ.) লক্ষ্মীপুরে আসেন। পরে তিনি গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করলে দীর্ঘ সময় ফিরে না আসায় স্থানীয়রা উদ্বিগ্ন হয়ে তাকে খুঁজতে যান।

লোককথায় বলা হয়, সেখানে তারা তাকে একটি পুরনো ইবাদতখানায় ইবাদতে মগ্ন অবস্থায় দেখতে পান এবং মসজিদের সামনে একটি বাঘ শান্তভাবে বসে ছিল। এমনকি তিনি কোরআন তিলাওয়াত করলে বন্য প্রাণীরাও শান্ত হয়ে তা শুনত—এমন কথাও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত।

তবে আজিম শাহের ষষ্ঠ বংশধর ও মসজিদের সহসভাপতি হাফেজ ময়ইদুল হক প্রতিবেদনে ভিন্ন একটি লোকবর্ণনা দিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আজিম শাহ (রহ.) দুটি বাঘের পিঠে চড়ে লক্ষ্মীপুরে এসেছিলেন। তিনি আরও জানান, এলাকাটি আগে নদীবেষ্টিত ছিল এবং এক আল্লাহর অলি প্রার্থনা করার পর নদী দূরে সরে গিয়ে এলাকাটি জঙ্গলে পরিণত হয়।

পুরনো মসজিদটি আবিষ্কারের সময় সেখানে মাত্র আটজনের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা ছিল। ১৮০০ শতকের শুরুর দিকে সংস্কারের মাধ্যমে তা বাড়িয়ে ২৪ জনের নামাজের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে প্রাচীন স্থাপনাটিকে অক্ষুণ্ন রেখে পাশে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক চারতলা মসজিদ, যেখানে একসঙ্গে ৫ হাজারের বেশি মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

দুটি মসজিদের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রামাণ্য ইতিহাসের সঙ্গে স্থানীয় লোককথা পাশাপাশি অবস্থান করছে। তিতাখাঁ মসজিদের নির্মাণকাল নিয়েই সরকারি ও স্থানীয় সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। আবার আজিম শাহ মসজিদকে ঘিরে বাঘ, জঙ্গল, নদী সরে যাওয়া ও আধ্যাত্মিক ঘটনাবলির যেসব কাহিনি প্রচলিত, সেগুলো মূলত লোকমুখে পাওয়া বর্ণনা; এগুলোকে যাচাই করা ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে উপস্থাপনের আগে গবেষণা প্রয়োজন।

লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসনের তথ্যভাণ্ডারেও তিতাখাঁ মসজিদকে জেলার উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এ স্থাপনাগুলোর বয়স, নির্মাতা, নির্মাণকাল, স্থাপত্যশৈলী ও সংস্কারের ইতিহাস নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও লিখিত গবেষণা হলে লক্ষ্মীপুরের আঞ্চলিক ইতিহাস আরও নির্ভরযোগ্যভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

লক্ষ্মীপুরের তিতাখাঁ ও আজিম শাহ জামে মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থান নয়; এগুলো স্থানীয় স্থাপত্য, ধর্মীয় ইতিহাস, জনপদ গড়ে ওঠা এবং লোকসংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তবে শত বছরের ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে - লোককথা ও প্রামাণ্য ইতিহাসকে পৃথক করে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সংরক্ষণ ও তথ্যনির্ভর নথিভুক্তকরণ এখন সময়ের দাবি।

সর্বশেষ
প্রকাশক ও সম্পাদক - সিকদার সাদেকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক- জাহিদুল হাসান জাহিদ
কার্যালয়ঃ ৪ দারুসসালাম রোড, মিরপুর, ঢাকা।
aazkaalbangla@gmail.com
মোবাইলঃ +8801842280000
আজকাল বাংলা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2021-2025 AjkalBangla.Com All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram