

এস এম আওলাদ হোসেন, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
বর্তমান সমাজে মানুষের পরিচয় নির্ধারণে রাজনৈতিক অবস্থান, দলীয় প্রভাব, সামাজিক জনপ্রিয়তা কিংবা অর্থনৈতিক প্রতিপত্তিকে অনেক সময় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কে কোন রাজনৈতিক দলের অনুসারী, কার সঙ্গে কার সখ্য, কে কতটা ক্ষমতাবান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার জনপ্রিয়তা কত বেশি—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষের মূল্যায়ন করার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়।
অথচ একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হওয়া উচিত তাঁর চরিত্র, নৈতিকতা, আচরণ, মানবিকতা ও অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মানসিকতা। সামাজিক বাস্তবতায় দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয় একজন মানুষকে সাময়িকভাবে প্রভাব, পরিচিতি কিংবা ক্ষমতার বলয়ে পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু সেই পরিচয় দিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্রের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। রাজনীতি মানুষের সেবা, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সমাজ পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অর্থ এই নয় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নৈতিকতা, সততা কিংবা মানবিক গুণাবলির অধিকারী হয়ে উঠবেন।
এসব গুণ অর্জন করতে হয় ব্যক্তিগত চর্চা, আত্মসংযম, দায়িত্বশীলতা ও সৎকর্মের মাধ্যমে। মানুষের চরিত্রের পরিচয় প্রকাশ পায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। তিনি অধস্তন কর্মচারী, সাধারণ মানুষ, দরিদ্র ব্যক্তি কিংবা ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেন—সেখানেই তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে। ক্ষমতাবানদের সামনে বিনয়ী অথচ দুর্বল মানুষের সামনে অহংকারী হয়ে ওঠা কখনোই উন্নত চরিত্রের পরিচায়ক হতে পারে না। একজন প্রকৃত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ নিজের অবস্থান কিংবা প্রভাবের কারণে অন্যকে ছোট করে দেখেন না। তিনি জানেন, সামাজিক মর্যাদা কাউকে অন্যের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের অধিকার দেয় না। বরং প্রকৃত মর্যাদা অর্জিত হয় মানুষের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, সত্য কথা বলা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করার মধ্য দিয়ে।
রাজনৈতিক মতাদর্শ মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ ও গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। প্রত্যেক নাগরিকের নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে কাউকে অন্ধভাবে সমর্থন করা কিংবা বিরোধী মতের মানুষকে অসম্মান করার প্রবণতা সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে পরিচিত হলেই তাঁর প্রতিটি কাজ সঠিক হয়ে যায় না। আবার ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী হলেই কেউ অসৎ কিংবা অযোগ্য হয়ে যান না। মানুষের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন হওয়া উচিত নিরপেক্ষভাবে, তাঁর কাজের গুণগত মান, সততা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে। রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, বিতর্ক থাকবে এবং সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু সেই সমালোচনা যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান কিংবা বিদ্বেষে পরিণত না হয়। একইভাবে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অন্যায়কে আড়াল করা কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার প্রবণতাও পরিহার করা জরুরি। ধর্ম মানুষের জীবনে নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার শিক্ষা দিতে পারে। তবে শুধু ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করা কিংবা ধর্মীয় বক্তব্য উপস্থাপন করাই একজন মানুষের নৈতিকতার পূর্ণ প্রমাণ নয়।
সেই শিক্ষার প্রতিফলন তাঁর ব্যবহার, লেনদেন, সত্যবাদিতা, আমানতদারি এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনের মধ্যেও থাকা প্রয়োজন। ইসলামে উত্তম চরিত্র ও মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-কলমের ৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহান চরিত্রের প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে সূরা আল-হুজুরাতের ১১ নম্বর আয়াতে একে অন্যকে উপহাস করা ও অপমানজনক নামে ডাকার ব্যাপারে নিষেধ করা হয়েছে। এসব শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দেয়, ধর্মীয় মূল্যবোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হলো মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা, অহংকার পরিহার করা এবং অন্যের প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ করা। ধর্মীয় পরিচয় ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়; আর সেই বিশ্বাসের নৈতিক প্রভাব প্রকাশ পায় মানুষের কর্ম ও ব্যবহারে। শিক্ষা মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করে, চিন্তার পরিধি প্রসারিত করে এবং সঠিক-ভুল বিচার করার সক্ষমতা তৈরি করতে সহায়তা করে। কিন্তু শিক্ষাগত সনদ অর্জন করলেই একজন মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনয়ী, দায়িত্বশীল কিংবা নৈতিক হয়ে ওঠেন না।
প্রকৃত শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হলো মানুষের কথাবার্তা, আচরণ, শিষ্টাচার, পরিমিতিবোধ এবং অন্যের মতামতকে সম্মান করার মানসিকতা। কেউ কত বড় পদে অধিষ্ঠিত কিংবা কতগুলো সনদ অর্জন করেছেন, তার পাশাপাশি তিনি নিজের জ্ঞান ও অবস্থানকে কীভাবে ব্যবহার করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা যদি মানুষকে অহংকারী করে তোলে, অন্যকে অবজ্ঞা করতে শেখায় কিংবা নিজের ভুল স্বীকারের ক্ষমতা কেড়ে নেয়, তাহলে সেই শিক্ষার মানবিক প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি, প্রচার ও জনপ্রিয়তা মানুষের সামাজিক অবস্থান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু জনপ্রিয়তা আর গ্রহণযোগ্যতা এক বিষয় নয়। প্রচার একজন মানুষকে পরিচিত করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সম্মান অর্জনের জন্য প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্যতা, দায়িত্বশীলতা ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ড। একজন মানুষের প্রকৃত মূল্যায়নে দেখতে হবে, তিনি বিপদে অন্যের পাশে দাঁড়ান কি না, নিজের ভুল স্বীকার করেন কি না, দায়িত্ব পালনে আন্তরিক কি না এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন কি না। এসব গুণই মানুষের ব্যক্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।
একটি সুস্থ, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে মানুষের পরিচয় নির্ধারণের মানদণ্ড হওয়া উচিত তাঁর বাস্তব কর্মকাণ্ড, চরিত্র ও নৈতিকতা। রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা সামাজিক অবস্থান—কোনোটিই মানুষের সামগ্রিক মূল্যায়নের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। পরিচয়ের চেয়ে আচরণ, প্রচারের চেয়ে কর্ম এবং বাহ্যিক মর্যাদার চেয়ে নৈতিকতার গুরুত্ব বেশি—এই উপলব্ধি ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য প্রয়োজনীয়। অতএব, কাউকে মূল্যায়নের আগে তাঁর পরিচয়ের বাহ্যিক আবরণে আটকে না থেকে দেখতে হবে তাঁর চরিত্র, কথাবার্তা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে সম্মানিত করে শুধু তার পরিচয় নয়, বরং সে কেমন মানুষ এবং অন্য মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে—সেই সত্যটাই।
অতএব, কাউকে মূল্যায়নের আগে তাঁর পরিচয়ের বাহ্যিক আবরণে আটকে না থেকে দেখতে হবে তাঁর চরিত্র, কথাবার্তা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে সম্মানিত করে শুধু তার পরিচয় নয়, বরং সে কেমন মানুষ এবং অন্য মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে—সেই সত্যটাই।
