

এস এম আওলাদ হোসেন। সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
একজন পুরুষের জীবন যেন এক নীরব যুদ্ধের নাম। যে যুদ্ধে প্রতিদিন তাঁকে লড়তে হয়, কিন্তু পরাজিত হওয়ার অধিকার নেই; কষ্ট পেতে হয়, কিন্তু কাঁদার স্বাধীনতা নেই; ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়তে হয়, অথচ বাইরে থেকে শক্ত থাকার অভিনয় করে যেতে হয়। কারণ সমাজ তাঁর কাঁধে দায়িত্বের পাহাড় চাপিয়ে দিয়েছে, কিন্তু সেই ভারে তাঁর কাঁধ কতটা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, তা দেখার সময় কারও নেই। সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার মুহূর্তেই শুরু হয় তাঁর আরেকটি যুদ্ধ। জীবিকার তাগিদে কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা, ঊর্ধ্বতনদের চাপ, অপমান, অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন—সবকিছু সহ্য করে দিন শেষে তাঁকে ফিরতে হয় পরিবারের কাছে। মুখে হাসি রাখতে হয়, যেন কোনো সমস্যাই তাঁকে স্পর্শ করেনি। অথচ বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারো দুশ্চিন্তা তাঁকে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করে। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে নিজের হাসিটাই কখন যে হারিয়ে ফেলেন, তার হিসাব রাখারও অবকাশ থাকে না।
একজন পুরুষের পকেট খালি হলে শুধু অর্থের অভাব হয় না, অনেক সময় বদলে যায় তাঁর প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও। যে মানুষটি একদিন পরিবারের ভরসা ছিলেন, উপার্জনে সংকট দেখা দিলে তিনিই হয়ে ওঠেন প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁর ত্যাগ তখন অতীত, তাঁর ব্যর্থতা বর্তমান। কেউ জানতে চায় না, কতটা লড়াই করে তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন; সবাই জানতে চায়, তিনি আর কতটা দিতে পারবেন। এ কেমন সমাজ, যেখানে একজন পুরুষের কাছ থেকে সবকিছু প্রত্যাশা করা হয়, অথচ তাঁর প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোর মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে? তিনি পরিবারের সবার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববেন, সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করবেন, বাবা-মায়ের বার্ধক্যের আশ্রয় হবেন, সংসারের অভাব মেটাবেন—কিন্তু নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলোর জন্য তাঁর কোনো জায়গা থাকবে না? তাঁরও যে ইচ্ছে ছিল, কিছু স্বপ্ন ছিল, কিছু ব্যক্তিগত চাওয়া ছিল—দায়িত্বের চাপে সেসব যে নীরবে মৃত্যুবরণ করে, তার খবর কে রাখে? সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো, অনেক পুরুষ তাঁর কষ্টের কথা বলতেও ভয় পান।
কারণ তাঁকে শেখানো হয়েছে, পুরুষ মানুষ কাঁদে না, দুর্বল হয় না, ভেঙে পড়ে না। তাই চোখের জল গিলে তিনি হাসেন, অপমান হজম করে নীরব থাকেন, অসহায়ত্ব লুকিয়ে আবার কাজে বেরিয়ে পড়েন। অথচ এই নীরবতা সব সময় সাহসের পরিচয় নয়; কখনো কখনো এটি এমন এক অসহায়ত্ব, যার ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন পুরুষ কি শুধুই উপার্জনের যন্ত্র? তাঁর মূল্য কি কেবল মাস শেষে ঘরে কত টাকা আনতে পারলেন, তার ওপর নির্ভর করবে? সংসারের জন্য তাঁর শ্রম থাকবে, ত্যাগ থাকবে, দায়িত্ব থাকবে—কিন্তু তাঁর বিশ্রাম, সম্মান, ভালোবাসা ও মানসিক প্রশান্তির অধিকার থাকবে না কেন? এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—পরিবারের সব দায়িত্ব পুরুষের একার নয়।
সংসার কোনো এক ব্যক্তির কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার নাম নয়; এটি পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধন। একজন পুরুষ যেমন পরিবারের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন, তেমনি তাঁর ক্লান্তি বোঝা, তাঁর পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁর অনুভূতিকে সম্মান করাও পরিবারের অন্য সদস্যদের দায়িত্ব। ভালোবাসা মানে শুধু তাঁর কাছ থেকে পাওয়া নয়, প্রয়োজনে তাঁকে আগলে রাখাও। আমাদের সমাজে পুরুষের সাফল্য নিয়ে আলোচনা হয়, ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা হয়; কিন্তু তাঁর নীরব যন্ত্রণা নিয়ে আলোচনা হয় কতটুকু? আমরা তাঁর উপার্জনের হিসাব রাখি, অথচ তাঁর হারিয়ে যাওয়া সময়ের হিসাব রাখি না। তাঁর দায়িত্বের তালিকা তৈরি করি, অথচ তাঁর ক্লান্তির তালিকা জানতে চাই না। তাঁর শক্তিকে স্বাভাবিক ধরে নিই, অথচ সেই শক্তির পেছনে জমে থাকা ক্ষতগুলো দেখতে ভুলে যাই।
মনে রাখতে হবে, যে মানুষটি প্রতিদিন পরিবারের জন্য যুদ্ধ করেন, তাঁরও কখনো আশ্রয় প্রয়োজন হয়। যিনি সবার চোখের জল মুছিয়ে দেন, তাঁরও কখনো চোখ ভিজে উঠতে পারে। যিনি সবাইকে সাহস দেন, তাঁরও কখনো সাহস হারিয়ে যেতে পারে। আর সেই মুহূর্তে তাঁকে দুর্বল বলে দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং তাঁর হাতটি শক্ত করে ধরে বলা দরকার—‘তুমি একা নও, তোমার দায়িত্বের বোঝা আমরা ভাগ করে নেব।’ একজন পুরুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট হয়তো দায়িত্ব পালন করা নয়; বরং দায়িত্ব পালন করতে করতে একদিন উপলব্ধি করা—তাঁর কষ্ট বোঝার মতো কেউ পাশে নেই। তাই সময় এসেছে পুরুষকে শুধু পরিবারের কর্তা হিসেবে নয়, একজন অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ হিসেবেও দেখার। তাঁর ত্যাগের স্বীকৃতি দিতে হবে, তাঁর বিশ্রামের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, তাঁর না বলা কথাগুলো শোনার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। কারণ দায়িত্বের ভারে নুয়ে পড়া মানুষটিকে আরও ভার চাপিয়ে নয়, তাঁর পাশে দাঁড়িয়েই শক্তিশালী করে তুলতে হয়। পরিশেষে বলতে চাই, যে পুরুষটি পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে নিজের কষ্ট আড়াল করেন, তাঁর মুখের হাসিটুকু রক্ষা করার দায়িত্বও পরিবারের।
তাঁর নীরবতাকে অভ্যাস ভেবে উপেক্ষা করবেন না, তাঁর ত্যাগকে কর্তব্য বলে অবমূল্যায়ন করবেন না। কারণ মানুষটি একদিন ক্লান্ত হয়ে থেমে গেলে, তখন হয়তো তাঁর অবদানের মূল্য বোঝা যাবে—কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় আর ফিরে পাওয়া যাবে না। একটি পরিবার তখনই সত্যিকার অর্থে সুন্দর হয়ে ওঠে, যখন সেখানে শুধু দায়িত্বের হিসাব হয় না, অনুভূতিরও মূল্য দেওয়া হয়; শুধু উপার্জনকারীর পরিচয় দেখা হয় না, মানুষটিকেও দেখা হয়।
