

এস এম আওলাদ হোসেনসাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
“যে দেশে জাতীয় ফল খেতেও হাতে তেল মাখতে হয়, সে দেশে তেল মেরে চলতে না পারলে আপনি কখনোই উন্নতি করতে পারবেন না”—কথাটি নিছক রসিকতা নয়; বরং যোগ্যতা ও তোষামোদের দ্বন্দ্বে জর্জরিত একটি সমাজের নির্মম বাস্তবতার প্রতি তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ।
একজন মানুষ বছরের পর বছর পড়াশোনা করেন, নিজের দক্ষতা বাড়ান, অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে আরেকজন ব্যস্ত থাকেন ক্ষমতাবানদের মন জোগাতে, কথায় কথায় প্রশংসা করতে, অন্যায়ের সামনে নীরব থাকতে এবং সুযোগ বুঝে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে। আশ্চর্যের বিষয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রথমজনকে অপেক্ষা করতে হয়, আর দ্বিতীয়জন পৌঁছে যান সাফল্যের সিঁড়ির অনেক ওপরে!
এ কেমন প্রতিযোগিতা, যেখানে মেধার সঙ্গে মেধার লড়াই হয় না, হয় মেধার সঙ্গে তোষামোদের? যেখানে কাজের মূল্যায়নের চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্যের মূল্য বেশি, সেখানে যোগ্য মানুষের হতাশ হওয়াটাই স্বাভাবিক।
যোগ্য মানুষ কাজ দিয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করেন, আর তোষামোদকারী অন্যের দুর্বলতা ও পছন্দকে পুঁজি করে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চান। যোগ্য ব্যক্তি চান তাঁর কাজ কথা বলুক; তোষামোদকারী চান তাঁর কথা শুনে ক্ষমতাবান ব্যক্তি খুশি হোন। একজন ভুল ধরিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে চান, অন্যজন নিজের অবস্থান ধরে রাখতে ভুলকেও সঠিক বলে প্রতিষ্ঠা করতে তৎপর হন।
যোগ্যতা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে, তোষামোদ মানুষকে নির্ভরশীল করে। যোগ্য ব্যক্তি সত্য বলার সাহস রাখেন, তোষামোদকারী অনেক সময় সুবিধা হারানোর ভয়ে সত্যকে আড়াল করেন। যোগ্য ব্যক্তি নিজের দক্ষতায় সম্মান অর্জন করেন, তোষামোদকারী অন্যের সন্তুষ্টির বিনিময়ে অনুগ্রহ লাভের চেষ্টা করেন। একজন চান তাঁর অর্জন তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করুক, অন্যজন চান প্রভাবশালী কারও সুপারিশ তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করুক।
তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন, যখন তোষামোদকারী শুধু নিজের উন্নতিই করেন না, বরং তাঁর চারপাশে এমন একটি বলয় তৈরি করেন, যেখানে যোগ্য ও স্বাধীনচেতা মানুষদের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে। তখন সত্য কথা বলা হয়ে যায় বেয়াদবি, যুক্তি তুলে ধরা হয়ে যায় অবাধ্যতা, আর অন্যায়ের প্রতিবাদ হয়ে দাঁড়ায় অপরাধ!
এমন পরিবেশে একজন দক্ষ কর্মকর্তা তাঁর কাজের জন্য নয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কতটা প্রিয়—তার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হতে পারেন। একজন মেধাবী কর্মী তাঁর উৎপাদনশীলতার চেয়ে কতটা অনুগত, সেই বিবেচনায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। একজন সৎ মানুষ নিজের নীতিতে অটল থাকার কারণে সুযোগ হারাতে পারেন, অথচ একজন সুবিধাবাদী অনায়াসে এগিয়ে যেতে পারেন।
অবশ্য সব প্রশংসাই তোষামোদ নয়, সব আনুগত্যও অন্যায় নয়। শিষ্টাচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীলতা সুস্থ কর্মপরিবেশের অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু প্রশংসা যখন সত্যকে চাপা দেয়, আনুগত্য যখন বিবেককে পরাজিত করে এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক যখন যোগ্যতার জায়গা দখল করে, তখন সেটি আর সৌজন্য থাকে না—তা হয়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের হাতিয়ার।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—যোগ্য মানুষ যদি যোগ্যতার মূল্য না পান, তাহলে নতুন প্রজন্ম কেন মেধা ও পরিশ্রমের ওপর আস্থা রাখবে? একজন তরুণ যদি দেখেন, বছরের পর বছর দক্ষতা অর্জনের চেয়ে ক্ষমতাবানদের মন জোগানো বেশি কার্যকর, তাহলে তাঁর কাছে সততা ও পরিশ্রমের প্রেরণা কোথায় থাকবে? এভাবেই তোষামোদ শুধু ব্যক্তির ক্ষতি করে না; এটি একটি জাতির কর্মসংস্কৃতি, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও দুর্বল করে দেয়।
যে প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার বদলে তোষামোদ পুরস্কৃত হয়, সেখানে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। কারণ সত্য বলার মানুষ কমে যায়, আর মন জোগানোর মানুষ বেড়ে যায়। সেখানে নেতৃত্বের চারপাশে প্রশংসার প্রতিধ্বনি শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবতার কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে। সবাই যখন প্রধান ব্যক্তিকে খুশি রাখতে ব্যস্ত, তখন প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সমস্যা দেখার ও সমাধান করার মানুষ কোথায়?
একটি রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান কিংবা সমাজ কখনোই কেবল চাটুকারদের ওপর ভর করে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যেতে পারে না। সাময়িকভাবে তোষামোদ কাউকে পদ, ক্ষমতা কিংবা সুবিধা এনে দিতে পারে; কিন্তু দক্ষতা, সততা ও দূরদর্শিতার বিকল্প হতে পারে না। কারণ প্রশংসা দিয়ে সিদ্ধান্তের ভুল ঢেকে রাখা যায়, কিন্তু তার পরিণতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না। সুপারিশ দিয়ে পদ পাওয়া সম্ভব, কিন্তু যোগ্যতা ছাড়া দায়িত্বের ভার বহন করা কঠিন।
তাই পরিবর্তন শুধু তোষামোদকারীদের সমালোচনা করে আসবে না; পরিবর্তন আনতে হবে মূল্যায়নব্যবস্থায়ও। নিয়োগ, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কাজের ফলাফলকে গুরুত্ব দিতে হবে। নেতৃত্বকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশ করা অপরাধ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সাহস হিসেবে বিবেচিত হয়।
সবচেয়ে বড় কথা, ক্ষমতাবানদের বুঝতে হবে—যে ব্যক্তি প্রতিটি কথায় তাঁদের প্রশংসা করেন, তিনি সব সময় তাঁদের শুভাকাঙ্ক্ষী নাও হতে পারেন। আর যিনি ভুল ধরিয়ে দেন, তিনি সব সময় বিরোধী নন; অনেক সময় তিনিই প্রকৃত মঙ্গলকামী। তোষামোদকারী ব্যক্তিকে খুশি করেন, কিন্তু যোগ্য ও সৎ মানুষ প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেন।
আমাদের এমন একটি সমাজ দরকার, যেখানে একজন মানুষকে তাঁর পরিচয়, প্রভাব কিংবা তোষামোদের দক্ষতা দিয়ে নয়, তাঁর কাজ, সততা, মেধা ও মানবিকতা দিয়ে বিচার করা হবে। যেখানে পদ হবে যোগ্যতার স্বীকৃতি, ব্যক্তিগত আনুগত্যের পুরস্কার নয়। যেখানে সত্য বলার জন্য মানুষকে মূল্য দিতে হবে না, আর অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য কেউ পুরস্কৃত হবেন না।
মনে রাখতে হবে, যোগ্যতা মানুষকে সম্মানের আসনে বসায়, আর তোষামোদ অনেক সময় মানুষকে সুবিধার আসনে বসায়—দুটি আসন দেখতে কাছাকাছি হলেও তাদের মর্যাদা এক নয়।
জাতীয় ফল কাঁঠাল খেতে হাতে তেল মাখতে হতে পারে, কিন্তু জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে তোষামোদের তেল মাখতেই হবে—এমন সমাজ কোনোভাবেই সুস্থ সমাজ হতে পারে না। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে মেধাবী মানুষকে মাথা নত করে নয়, মাথা উঁচু করে এগিয়ে যেতে হবে; যেখানে তোষামোদের শব্দ নয়, যোগ্যতার কাজই হবে সাফল্যের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয়।
কারণ যে সমাজে যোগ্যতা অপেক্ষা করে আর তোষামোদ পুরস্কার পায়, সে সমাজে ব্যক্তির উন্নতি হতে পারে, কিন্তু জাতির প্রকৃত উন্নতি বাধাগ্রস্ত হয়।
