ঢাকা
প্রকাশিত : October 19, 2026
আপডেট: October 19, 2026
প্রকাশিত : October 19, 2026

শ্রমিক থেকে ক্ষেতমজুর নেতা: কমরেড ইমান আলীর জীবনসংগ্রাম

মো. নজরুল ইসলাম,মানিকগঞ্জ।।

একসময় হাতে তুলে নিয়েছিলেন শ্রমিকের অধিকার আদায়ের লাল পতাকা। কারখানার শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, চিকিৎসা ভাতা ও পেনশনের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন, সহ্য করেছেন নির্যাতন, মামলা ও কারাবরণ। পরবর্তী সময়ে নিজেকে যুক্ত করেছেন ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। চরের খাসজমি উদ্ধার থেকে শুরু করে স্থানীয় সামাজিক আন্দোলন—দীর্ঘ জীবনের প্রতিটি পর্বেই থেকেছেন মেহনতি মানুষের পাশে। বয়স সত্তর পেরিয়েছে, শরীরেও বাসা বেঁধেছে নানা অসুস্থতা। তবু থামেনি তাঁর সংগ্রামী পথচলা।

তিনি কমরেড ইমান আলী—মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের শ্রমিক ও ক্ষেতমজুর আন্দোলনের এক পরিচিত মুখ। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে ওঠা মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার পদ্মাপাড়ের বলরা ইউনিয়নের দানেস্তপুর গ্রাম। এই গ্রামের এক প্রান্তিক কৃষক পরিবারে জন্ম ইমান আলীর। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সাহসী, প্রতিবাদী ও ডানপিটে স্বভাবের। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ভর্তি হন দক্ষিণ চাঁদপুর উচ্চবিদ্যালয়ে। তাঁর বাবা মরহুম মো. আবুল হাশেমও ছিলেন দারিদ্র সঙ্গে লড়াই করা একজন মানুষ। কৃষিকাজে সংসার চালাতে না পেরে একসময় চাকরি নেন জুটমিলে। কিন্তু যৌথ পরিবারের অভাব-অনটন কিছুতেই কাটছিল না। সংসারের সীমিত আয় দিয়ে পরিবারের চাহিদা মেটানো ছিল কঠিন। ইমান আলী যখন এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন অর্থাভাবে তাঁর বাবা পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়ায় দারিদ্র্য। ক্ষোভ, দুঃখ ও অভিমান নিয়ে একপর্যায়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান কিশোর ইমান আলী। সেই বাড়ি ছাড়ার ঘটনা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

জীবিকার সন্ধানে খুলনায় গিয়ে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়। আর সেই অধ্যায় থেকেই ধীরে ধীরে একজন সাধারণ শ্রমিকের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামী হয়ে ওঠার পথ তৈরি হয়। জুটমিলের শ্রমিক থেকে আন্দোলনের অগ্রসারিতে খুলনায় গিয়ে ইমান আলী চাকরি নেন স্টোন জুটমিলে। প্রথমে বদলি শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে সিভিসি বিভাগে পদোন্নতি পান। কিন্তু তাঁর কাছে কর্মজীবন কেবল জীবিকা নির্বাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মিলের ভেতরে শ্রমিকদের বঞ্চনা, কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের প্রশ্ন তাঁকে আন্দোলনের দিকে টেনে নেয়। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে গড়ে ওঠা সভা, মিছিল ও আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। এই সূত্রেই পরিচয় ঘটে তৎকালীন শ্রমিক আন্দোলনের পরিচিত নেতাদের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কমরেড সরদার মোতাহার হোসেন, খুলনার কমরেড রতন সেন এবং শেখ মনিরুজ্জামান। শ্রমিকদের ঐক্য, সংগঠন ও অধিকার আদায়ের

সংগ্রাম সম্পর্কে তাঁদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন ইমান আলী। ক্রমে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। চাকরিরত অবস্থাতেই হরিরামপুর উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের ইব্রাহিমপুর গ্রামে পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। সংসার, সন্তান ও জীবিকার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চলতে থাকে তাঁর আন্দোলন-সংগ্রাম। বর্তমানে তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। দাবি আদায়ের লড়াই, নির্যাতন ও কারাবরণ খুলনায় অবস্থানকালে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের ব্যানারে শ্রমিকদের বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নেন ইমান আলী।

তাঁর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ঐতিহাসিক ৫ দফা, ৭ দফা, ১১ দফা ও ৮ দফা দাবির আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও পেনশনসহ ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে। আন্দোলন দমনে শ্রমিকদের ওপর নেমে আসে পুলিশি নির্যাতন, মামলা ও গ্রেপ্তারের মতো ঘটনা। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও আন্দোলন থেকে সরে আসেননি তিনি। ইমান আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে। একপর্যায়ে টানা ছয় মাস কারাভোগের পর মুক্তি পান তিনি। দীর্ঘ এই বন্দিজীবন তাঁর মনোবল ভেঙে দিতে পারেনি। বরং শ্রমিকদের দাবি আদায়ের খবর তাঁকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করেছিল। শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত মিল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিছু দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় বলে জানান তিনি।

এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছিল, অধিকার সহজে পাওয়া যায় না; সংগঠিত মানুষের দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই তা অর্জন করতে হয়। পরবর্তী সময়ে ক্ষেতমজুর আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও শ্রমিকজীবনের এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শ্রমিকজীবন ছেড়ে ফিরলেন মানিকগঞ্জে সন্তানেরা কিছুটা বড় হওয়ার পর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন ইমান আলী। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মানিকগঞ্জ জেলার তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড আজহারুল ইসলাম আরজু ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড মিজানুর রহমান হযরতের আহ্বান এবং সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তে চাকরি ছেড়ে মানিকগঞ্জে ফিরে আসেন তিনি। তখন মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেতমজুর ও ভূমিহীন মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছিল। হরিরামপুরে সে সময় ২৪টি নিবন্ধিত ক্ষেতমজুর সমিতি ছিল বলে জানান ইমান আলী।

মানিকগঞ্জ সদরেও ছিল উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সমিতি। গ্রামভিত্তিক এসব সংগঠন ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষিশ্রমিকদের অধিকার আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। জমির মালিকানা, খাসজমির ব্যবহার, কৃষিশ্রমের ন্যায্য মূল্য এবং প্রভাবশালীদের দখলদারত্বের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছিল ক্ষেতমজুর আন্দোলন। ইমান আলীও যুক্ত হন সেই আন্দোলনে। এবার তাঁর সংগ্রামের ক্ষেত্র কারখানার শ্রমিকদের অধিকার থেকে বিস্তৃত হয়ে দাঁড়ায় গ্রামের ভূমিহীন মানুষের জমি, জীবিকা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে। ডুবাইলের খাসজমি উদ্ধারের স্মৃতি হরিরামপুরের ডুবাইল গ্রামের ক্ষেতমজুর আন্দোলন ইমান আলীর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড রতন সাহা ওই এলাকায় ভূমিহীন মানুষের দুরবস্থা ও সংগ্রামের ইতিহাস বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন কমরেড ইমান আলীর জীবনকথা কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত সংগ্রামের বিবরণ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলন, ক্ষেতমজুরদের সংগঠিত হওয়ার ইতিহাস এবং গ্রামীণ ভূমিহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার নানা অধ্যায়। এই ইতিহাসের অনেক কিছুই এখনো সংরক্ষিত হয়নি। আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত স্মৃতি, স্থানীয় সংগঠনের নথি, পুরোনো সংবাদপত্র, মামলা-মোকদ্দমার দলিল এবং জমি বন্দোবস্তের সরকারি কাগজপত্র একত্র করা গেলে মানিকগঞ্জের শ্রমিক ও ক্ষেতমজুর আন্দোলনের একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস রচনা সম্ভব। ইমান আলীর মতো প্রবীণ আন্দোলনকর্মীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, তাঁদের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করা এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তির বক্তব্য সংগ্রহ করা জরুরি।

কারণ, তাঁদের স্মৃতির মধ্যেই সংরক্ষিত রয়েছে স্থানীয় মানুষের অধিকার আদায়ের অনেক অনুলিখিত ইতিহাস। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা কমরেড ইমান আলী আজও সেই ইতিহাসের একজন জীবন্ত সাক্ষী। দারিদ্র্েযর কারণে কৈশোরে ঘর ছেড়ে যাওয়া এক কিশোর থেকে শ্রমিক আন্দোলনের কর্মী, সেখান থেকে ক্ষেতমজুরদের অধিকার আদায়ের নেতা—তাঁর এই পথচলা প্রমাণ করে, মানুষের জীবনে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কখনো কখনো বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিলেমিশে যায়।

শরীরের শক্তি কমে আসতে পারে, বয়সের কারণে চলার গতি ধীর হতে পারে; কিন্তু যে মানুষ জীবনের বড় একটি অংশ অধিকারবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাটিয়েছেন, তাঁর সংগ্রামের অভিজ্ঞতা সমাজের জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকে। কমরেড ইমান আলীর জীবনসংগ্রাম তাই শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; এটি বর্তমান প্রজন্মের জন্যও একটি প্রশ্ন রেখে যায়—যাঁরা সমাজের উৎপাদন ও জীবনধারণের ভিত্তি গড়ে তোলেন, তাঁদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আমরা কতটা এগিয়ে এসেছি ?

সর্বশেষ
প্রকাশক ও সম্পাদক - সিকদার সাদেকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক- জাহিদুল হাসান জাহিদ
কার্যালয়ঃ ৪ দারুসসালাম রোড, মিরপুর, ঢাকা।
aazkaalbangla@gmail.com
মোবাইলঃ +8801842280000
আজকাল বাংলা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2021-2025 AjkalBangla.Com All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram