

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই স্বাধীনতা কখনোই আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড, প্রতারণা, চাঁদাবাজি কিংবা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করার লাইসেন্স নয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু কথিত সাংবাদিকের অপকর্ম আজ প্রকৃত সাংবাদিকতার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিকতা পেশাকে সন্দেহের চোখে দেখতে বাধ্য হচ্ছেন।
সাংবাদিকতা কোনো সংগঠনের সদস্যপদ, ক্ষমতাবান নেতার আশীর্বাদ কিংবা বিশেষ গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের নাম নয়। সাংবাদিকতা হলো সত্য অনুসন্ধান, জনস্বার্থ রক্ষা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পেশা। অথচ একটি অসাধু চক্র সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে অপসাংবাদিকতা, ব্ল্যাকমেইল, মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং ব্যক্তি চরিত্রহননের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এসব কর্মকাণ্ড কেবল নৈতিক অপরাধ নয়, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেও দণ্ডনীয়।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী প্রতারণা (ধারা ৪১৫ ও ৪২০), ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আদায় বা চাঁদাবাজি (ধারা ৩৮৩ ও ৩৮৪), মানহানি (ধারা ৪৯৯ ও ৫০০) এবং অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন (ধারা ৫০৬)—এসব অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। কেউ যদি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে এসব অপরাধ সংঘটিত করেন, তবে তাঁর সাংবাদিক পরিচয় অপরাধের দায় কমায় না; বরং জনবিশ্বাস ভঙ্গের কারণে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।
এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অনলাইনে মিথ্যা তথ্য প্রচার, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতারণা, পরিচয় অপব্যবহার কিংবা ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তবে এই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রকৃত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সাংবিধানিক অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়েও রাষ্ট্রকে সমানভাবে সতর্ক থাকতে হবে।
অন্যদিকে, সাংবাদিক সংগঠনগুলোরও আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। সংগঠন যদি শুধুই পরিচয়পত্র বিতরণ, প্রভাব বিস্তার বা ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে অপসাংবাদিকতার বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে না। সদস্যপদ প্রদানের ক্ষেত্রে পেশাগত যোগ্যতা, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে প্রকৃত সম্পৃক্ততা, নৈতিকতা ও আচরণবিধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ কমিটি গঠন, প্রমাণিত অনিয়মে সদস্যপদ বাতিল এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে সংগঠনগুলোকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজেরও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। প্রকৃত সাংবাদিক যেন হয়রানির শিকার না হন এবং অপরাধীরা যেন সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে পার পেয়ে যেতে না পারে—এই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
মনে রাখতে হবে, একজন ভুয়া চিকিৎসকের অপরাধ যেমন চিকিৎসা পেশাকে কলঙ্কিত করে, তেমনি একজন কথিত সাংবাদিকের অপরাধও পুরো সাংবাদিক সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়; এটি সাংবাদিকতার মর্যাদা, গণতন্ত্র এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকার রক্ষার সংগ্রাম।
এস এম আওলাদ হোসেন। সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
