

এস এম আওলাদ হোসেন,সাংবাদিক ও কলামিস্ট:
রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের জানমাল রক্ষা করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যেই দেশে আদালত, পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অপরাধ দমন কখনোই ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত হওয়ার কথা নয়। কারণ আইনের শাসনের মূল ভিত্তিই হলো—বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, ব্যক্তির ইচ্ছায় নয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে উদ্বেগজনক একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কিছু নামধারী রাজনৈতিক নেতা, স্বঘোষিত সমাজসেবক কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। তারা কখনো মাদকবিরোধী অভিযান, কখনো সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের নামে মানুষকে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন, প্রকাশ্যে অপদস্থ করছেন, এমনকি অস্ত্র বা মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আইনবিরোধী নয়, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর জন্যও অত্যন্ত বিপজ্জনক।
প্রশ্ন হলো, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার তারা কোথায় পেলেন? কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধীও হন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কি একজন রাজনৈতিক নেতার আছে? একজন নাগরিককে গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ বা অপরাধী প্রমাণ করার এখতিয়ার কি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে রাষ্ট্র দিয়েছে? উত্তর হলো—না।
আরও বড় প্রশ্ন হচ্ছে, যদি কোনো এলাকায় ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের উদ্যোগে আইন প্রয়োগ করতে শুরু করে, তাহলে সেখানে কর্মরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকা কী? তারা কি অকার্যকর হয়ে পড়েছেন? নাকি এমন কর্মকাণ্ডের প্রতি নীরব সমর্থন রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। কারণ জনগণ যখন পুলিশের পরিবর্তে কোনো রাজনৈতিক নেতার ভয় পেতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে আইনের শাসন দুর্বল হচ্ছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের সুযোগ তৈরি হওয়া। কোনো ব্যক্তিকে প্রতিপক্ষ মনে হলেই তাকে মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী বা অপরাধী আখ্যা দিয়ে সামাজিকভাবে হেয় করা, হয়রানি করা কিংবা মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার পথ খুলে যায়। এতে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যায়, আর নিরপরাধ মানুষ হয় নিপীড়নের শিকার।
এ অবস্থার দায় শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নয়; প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি আরও কার্যকর, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করে, তাহলে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আইন হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয় না। জনগণও তখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের গণআন্দোলন—প্রতিটি সংগ্রামের মূল চেতনা ছিল মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠা।
সেই রক্তস্নাত অর্জনের বাংলাদেশে যদি আবার ব্যক্তি-শাসন, গোষ্ঠী-শাসন কিংবা ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা স্বাধীনতার চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব দুর্বল হলে এবং ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। আর এর প্রভাব পড়ে সরকারের ভাবমূর্তির ওপরও। জনগণ তখন সরকারের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাকেই বেশি দেখতে শুরু করে।
মাদক ও সন্ত্রাস অবশ্যই দমন করতে হবে। কিন্তু সেই দমন হতে হবে আইন, প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়কে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, ব্যক্তি-শাসন নয়; বিচার হবে আদালতে, জনতার মঞ্চে নয়; অপরাধ দমন করবে রাষ্ট্র, কোনো স্বঘোষিত বাহিনী নয়।
কারণ স্বাধীন দেশের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার শক্তিশালী আইনব্যবস্থা, কোনো ব্যক্তির ক্ষমতা নয়।
