

এস এম আওলাদ হোসেন,সাংবাদিক ও কলামিস্ট:
একজন ব্যক্তির পরিচয় নয়, তিনি একটি পরিবারের ছায়া, সমাজের মূল্যবোধের প্রতিচ্ছবি এবং সন্তানের জন্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক। একজন মা যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে যান, তখন তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি, আদর্শ ও শিক্ষাই হয়ে ওঠে উত্তরসূরিদের পথচলার পাথেয়। কিন্তু কখনো কখনো মৃত্যুর পর একজন মায়ের বিদায় আমাদের সামনে এমন কিছু বাস্তবতা উন্মোচন করে, যা সমাজের জন্য লজ্জাজনক এবং বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
সম্প্রতি ঢাকায় নুরজাহান বেগম নামের এক রত্নগর্ভা মায়ের মৃত্যুর ঘটনা দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, তাঁর সন্তানদের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং একজন প্রবাসী। অথচ সেই মায়ের মৃত্যুর খবরও সময়মতো জানতে পারেননি সন্তানেরা। কয়েকদিন পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য একটি নির্মম বার্তা বহন করে। এটি প্রমাণ করে, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পদমর্যাদা কিংবা অর্থনৈতিক সাফল্য সব সময় মানবিকতার নিশ্চয়তা দেয় না।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, জীবদ্দশায় মা-বাবার প্রতি অবহেলা করা সন্তানরা মৃত্যুর পর সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় বড় বড় আয়োজন করলেও তাঁদের জীবনের শেষ সময়ে প্রয়োজনীয় সেবা, চিকিৎসা বা মানসিক সঙ্গ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক বৃদ্ধা মা সন্তানের ঘরে থেকেও নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছেন, কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছেন বৃদ্ধাশ্রমে, আবার কেউ চিকিৎসার অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করেছেন। মৃত্যুর পর তাঁদের জানাজা, দাফন কিংবা স্মরণসভা যত জাঁকজমকপূর্ণই হোক না কেন, জীবনের শেষ সময়ের অবহেলা সেই আয়োজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বাংলাদেশের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং পারিবারিক বন্ধনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু নগরায়ণ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা অনেক ক্ষেত্রেই কমে যাচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন বয়োজ্যেষ্ঠ মা-বাবারা।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মা-বাবার মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। ইসলাম ধর্মে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত বলা হয়েছে। তাই মায়ের মৃত্যুর পর শোক প্রকাশের চেয়ে জীবিত অবস্থায় তাঁর প্রতি দায়িত্ব পালনই প্রকৃত সন্তানের পরিচয় বহন করে।
“চলে গেলেন মা, দিয়ে গেলেন লজ্জা”— এই বাক্যটি কেবল একজন মায়ের মৃত্যু নয়, বরং আমাদের সামাজিক ব্যর্থতার প্রতীক। এটি সেই লজ্জা, যা অবহেলিত বার্ধক্যের; সেই লজ্জা, যা সন্তানের দায়িত্বহীনতার; সেই লজ্জা, যা মানবিক মূল্যবোধের ক্রমাবনতির।
একজন মা চলে যাওয়ার পর তাঁর জন্য অশ্রু ঝরানো সহজ, কিন্তু তিনি বেঁচে থাকতে তাঁর চোখের জল মুছে দেওয়াই ছিল প্রকৃত কর্তব্য। নুরজাহান বেগমের নিঃসঙ্গ মৃত্যু আমাদের সেই কঠিন সত্যটিই আবার স্মরণ করিয়ে দিল। একজন সন্তানের প্রকৃত পরিচয় তার পদ-পদবি বা সম্পদে নয়, বরং বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি তার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধে।
