

এস এম আওলাদ হোসেন,সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির ইতিহাস বারবার একটি সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে—ক্ষমতার দাপট এবং পেশীশক্তি কখনোই চিরস্থায়ী নয়। সাময়িকভাবে এগুলো দিয়ে মানুষকে ভয় দেখানো, প্রভাব বিস্তার করা কিংবা কিছু সুবিধা আদায় করা সম্ভব হলেও সময়ের প্রবাহে সবকিছুরই হিসাব দিতে হয়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে ক্ষমতা জনগণের আস্থা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়, তা একসময় ভেঙে পড়তে বাধ্য।
আমাদের দেশেও বিভিন্ন সময়ে জনগণ ক্ষমতার উত্থান-পতন প্রত্যক্ষ করেছে। যারা নিজেদের অপরাজেয় মনে করেছেন, তারাও একদিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। কারণ গণতান্ত্রিক সমাজে জনগণই শেষ কথা।
মানুষের অধিকারকে উপেক্ষা করে, ভিন্নমতকে দমন করে কিংবা পেশীশক্তির প্রদর্শন ঘটিয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকা যায় না। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় এই শিক্ষাই দেয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনও কিছু মানুষ সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি। তারা মনে করেন ক্ষমতা কিংবা প্রভাবই সবকিছু। ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রভাব খাটানো, প্রতিপক্ষকে হেয় করা কিংবা শক্তির মহড়া দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ এসব আচরণ সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে, আইনের শাসনকে দুর্বল করে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে ব্যক্তির শক্তির চেয়ে আইনের শক্তি বড়। সেখানে কারও পরিচয়, পদ-পদবি বা রাজনৈতিক অবস্থান নয়; বরং আইন ও ন্যায়বিচারই হওয়া উচিত প্রধান নিয়ামক। যখন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতাকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করতে শুরু করে, তখন সমাজে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পায়। এর ক্ষতিকর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো জাতিকেই বহন করতে হয়।
ক্ষমতার অহংকার মানুষকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তখন সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা থাকে না, ভিন্নমতকে শত্রু মনে হয় এবং নিজের ভুলগুলোও চোখে পড়ে না। কিন্তু সময় একদিন সবকিছুর বিচার করে। ইতিহাসে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরাও জনগণের বিচারের মুখে পরাজিত হয়েছেন।
বর্তমান সময়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং আইনের প্রতি আনুগত্য। শক্তি প্রদর্শনের সংস্কৃতি নয়, বরং যুক্তি, নৈতিকতা ও জনকল্যাণের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া যায় সেবা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে; ভয়ভীতি বা পেশীশক্তির মাধ্যমে নয়।
তাই যারা এখনও ক্ষমতার দাপট আর পেশীশক্তি দিয়ে ‘হাডুডু’ খেলতে চান, তাদের জন্য ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু কর্মের মূল্যায়ন স্থায়ী। আজ যে শক্তি নিয়ে অহংকার করা হচ্ছে, কাল তা নাও থাকতে পারে। সুতরাং সময় থাকতে আত্মসমালোচনা করা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং জনগণের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
