

“মচকে গেছি মাত্র — ভেঙে যাইনি মোটেই”,
এক নির্ভীক সাংবাদিকের জীবনসংগ্রাম
এস এম নাফিউল রিয়াদ (ফাহিম)
জীবনে কিছু মানুষ থাকেন, যাদের পরিচয় শুধু একটি নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি সাহসের প্রতীক, একটি সংগ্রামের নাম, একটি অনুপ্রেরণার গল্প। আমার বাবা এস এম আওলাদ হোসেন ঠিক তেমনই একজন মানুষ—যিনি জীবনের অসংখ্য ঝড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকেও কখনো হার মানেননি।
২০১৮ সালের ২৩ মে তাঁর লেখা একটি ফেসবুক পোস্ট আজও আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেখানে তিনি লিখেছিলেন—“মচকে গেছি মাত্র, ভেঙে যাইনি মোটেই।” এই একটি বাক্য যেন তাঁর সমগ্র জীবনের প্রতিচ্ছবি। কত কষ্ট, কত অবহেলা, কত না বলা অভিমান আর কত ত্যাগ লুকিয়ে আছে এই কথার ভেতরে—তা হয়তো খুব কম মানুষই বুঝতে পেরেছেন।
আমি একজন সন্তান হিসেবে দেখেছি, একজন মানুষ কীভাবে নিজের অসুস্থ শরীর নিয়েও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম চালিয়ে যেতে পারেন। দেখেছি, কীভাবে মানুষ দূরে সরে গেলেও তিনি মানুষের জন্যই লিখে গেছেন। অনেকেই যখন ভেবেছেন তিনি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না, ঠিক তখনই তিনি আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন নতুন শক্তিতে। কারণ তিনি হার মানতে শেখেননি।
সাংবাদিকতা তাঁর কাছে শুধু পেশা ছিল না; ছিল এক ধরনের ইবাদত। মানুষের কষ্ট, অন্যায়ের প্রতিবাদ, সমাজের অসংগতি—সবকিছুই তাঁর কলমে উঠে এসেছে নির্ভয়ে। সত্য বলার কারণে তিনি যেমন ভালোবাসা পেয়েছেন, তেমনি হয়েছেন অনেকের অপছন্দের মানুষও। কিন্তু তিনি কখনো আপস করেননি।
আজকের এই স্বার্থের পৃথিবীতে মানুষ খুব সহজেই সম্পর্ক ভুলে যায়। প্রয়োজন শেষ হলে দূরে সরে যায়। কিন্তু আমার বাবা সবসময় মানুষকে আপন করে নিতে চেয়েছেন। নতুন-পুরাতন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে চেয়েছেন। আর সেই সরলতা, সেই আন্তরিকতার মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে বারবার।
আমি জানি, একজন সাংবাদিকের জীবন বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, ভেতরে ততটাই কঠিন। রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটানো, মানুষের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করা, অসুস্থ শরীর নিয়েও ছুটে চলা—এসবের সাক্ষী আমি নিজেই। তাই বাবার সেই পোস্টের প্রতিটি শব্দ আজ আমার কাছে শুধু লেখা নয়, একেকটি জীবন্ত অনুভূতি।
তিনি লিখেছিলেন, “মানুষের কল্যাণে কাজ করেছি বলেই আমি হারিয়ে গেলেও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকব।” একজন সন্তান হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, তিনি সত্যিই মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। কারণ একজন সৎ ও মানবিক মানুষ কখনো হারিয়ে যান না; তাঁর কর্মই তাঁকে অমর করে রাখে।
আজ যখন সমাজে সত্য বলার মানুষ কমে যাচ্ছে, তখন আমার বাবা এখনও আমার কাছে সাহসের আরেক নাম। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন—জীবনে পড়ে যাওয়া লজ্জার নয়, লজ্জা হলো উঠে দাঁড়াতে না পারা। তিনি মচকেছেন, আহত হয়েছেন, কষ্ট পেয়েছেন; কিন্তু কখনো ভেঙে পড়েননি।
এই লেখাটি কোনো বড় সাহিত্যকর্ম নয়। এটি একজন সন্তানের হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা কিছু অনুভূতির প্রকাশ। একজন বাবাকে নিয়ে গর্ব করার ছোট্ট চেষ্টা। একজন নির্ভীক সাংবাদিক, একজন মানবিক মানুষ এবং একজন সংগ্রামী বাবার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আমার বাবার জন্য সবার দোয়া ভালোবাসা প্রত্যাশা
এস এম নাফিউল রিয়াদ (ফাহিম)
