

এস এম আওলাদ হোসেন, সাংবাদিক ও কলামিস্ট:
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রযুক্তির প্রসার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের বাস্তবতায় সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটেছে। এই পরিবর্তনের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে নানা ধরনের সাংবাদিকের চিত্র—কেউ ইতিবাচক, কেউ বিতর্কিত, কেউবা বিপজ্জনক।
রাজধানীর বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল-এ ছোট ছোট সাইনবোর্ড টাঙিয়ে তথাকথিত “সাংবাদিক বানানোর” কারখানা গড়ে ওঠার অভিযোগ নতুন নয়। এই ‘সাইনবোর্ড’ কিংবা ‘আইডিকার্ড’ নির্ভর সাংবাদিকতার আড়ালে কখনও কখনও প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজির ঘটনা সামনে আসে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো পেশার ভাবমূর্তি।
অন্যদিকে ‘ভুয়া সাংবাদিক’ পরিচয়ে যারা অপকর্মে জড়ায়, তারা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়—গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও হুমকি। একটি পরিচয়পত্র গলায় ঝুলিয়ে সংবাদকর্মীর মর্যাদা দাবি করা সহজ; কিন্তু তথ্য যাচাই, নৈতিকতা রক্ষা ও জনস্বার্থে কাজ করা অনেক কঠিন।
প্রেসক্লাবকেন্দ্রিক আড্ডাবাজি, দলীয় আনুগত্য কিংবা বহুমাত্রিক পরিচয়ের বাহাদুরি—এসবও পেশাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সাংবাদিকতা যখন রাজনৈতিক আনুগত্যের তৃতীয় পেশায় পরিণত হয়, তখন সত্যের চেয়ে সুবিধা বড় হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতার পালাবদলে অবস্থান বদলের সংস্কৃতি সংবাদমাধ্যমকে নিরপেক্ষতার জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়।
প্রবাসে বসে ‘ভবিষ্যতদ্রষ্টা’ বিশ্লেষণ, মৌসুমি সক্রিয়তা কিংবা শখের বশে সাংবাদিকতা—এসব প্রবণতাও বাস্তবতা। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো ‘অপসাংবাদিকতা’ ও ‘দালালি সাংবাদিকতা’।
একসময় সাংবাদিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-এর নির্বাচনে বিপুল ভোট বাতিলের ঘটনা পেশাগত দক্ষতা ও মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। আর যখন সংবাদ বিকৃত হয় ব্যক্তিগত স্বার্থে বা প্রভাবশালীদের সুবিধার্থে, তখন তা শুধু নৈতিক বিচ্যুতি নয়—গণতন্ত্রের জন্যও বিপদসংকেত।
তবুও আশার আলো নিভে যায়নি। এখনো ‘বঞ্চিত’ ও ‘লাঞ্ছিত’ সাংবাদিকদের একটি অংশ নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। হুমকি, হামলা, মামলা—সবকিছুর মাঝেও তারা তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে জনস্বার্থে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তাদের অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা পান না, কিন্তু পেশার আদর্শ ছাড়েন না।
সমাজ আজ যে ‘কাঙ্খিত সাংবাদিক’-এর প্রত্যাশা করে, তিনি হবেন সুশিক্ষিত, ন্যায়নিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ। তার কাছে সংবাদ হবে দায়িত্ব, ক্ষমতার সান্নিধ্য নয়; কলম হবে সত্যের পক্ষে, কোনো গোষ্ঠীর পক্ষে নয়।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধি। পেশাজীবী সংগঠনগুলোর কার্যকর ভূমিকা, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা এবং সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও নৈতিক মানদণ্ড জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে ভুয়া ও অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়—এটি গণতন্ত্রের প্রহরী। যদি এই প্রহরীর হাতে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রদীপ নিভে যায়, তবে অন্ধকার শুধু গণমাধ্যমে নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। তাই সময় এসেছে বিভ্রান্তির তালিকা নয়, আদর্শের তালিকা বড় করার।
