

দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণ সমাজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই তরুণরাই আজ সবচেয়ে বেশি হতাশ, বিভ্রান্ত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে কর্মক্ষম বয়সী তরুণদের প্রায় ২০–২৫ শতাংশ সরাসরি বেকার, আর এর বাইরে আরও বড় একটি অংশ রয়েছে আংশিক কর্মসংস্থানে বা যোগ্যতার তুলনায় অনেক কম মানের কাজে যুক্ত। যারা একদিন স্বপ্ন দেখত নিজের যোগ্যতা দিয়ে সমাজ বদলাবে, আজ তারাই প্রশ্ন করছে। এই দেশে আদৌ তাদের জন্য কোনো জায়গা আছে কি না।
এই হতাশা হঠাৎ তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা ব্যর্থতা, অব্যবস্থা এবং অবহেলার ফল।
একজন তরুণের জীবনের পথ সাধারণত তিনটি ধাপে এগোয় শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠা। দুঃখজনকভাবে এই তিনটি ক্ষেত্রেই আজ গভীর সংকট বিরাজ করছে।
প্রথমে শিক্ষা ব্যবস্থার কথাই ধরা যাক। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো মূলত মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। বিভিন্ন শিক্ষাবিষয়ক জরিপে দেখা যায়, শহরাঞ্চলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো না কোনোভাবে কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীল। গ্রামাঞ্চলেও এই হার কমপক্ষে ৪৫–৫০ শতাংশ। এখানে শেখার চেয়ে নম্বর বেশি গুরুত্বপূর্ণ, দক্ষতার চেয়ে সনদ বেশি মূল্যবান। একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর পড়াশোনা করে বের হয়, কিন্তু বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। ফলে ডিগ্রি হাতে নিয়েও সে আত্মবিশ্বাসী নয়। মনে প্রশ্ন জাগে এত পড়াশোনা করে কী লাভ হলো?
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিং ও গাইডনির্ভর সংস্কৃতি। শিক্ষার আনন্দ হারিয়ে গেছে, রয়ে গেছে শুধু প্রতিযোগিতা ও চাপ। মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষাজীবনেই প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ বা উদ্বেগে ভোগে। অনেক তরুণ পড়াশোনার সময়ই মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই ক্লান্তি ভবিষ্যৎ জীবনে গিয়েও আর কাটে না।
শিক্ষা শেষে আসে সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা চাকরি। প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হচ্ছে, কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে না সেই হারে। বিভিন্ন শ্রমবাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার সাধারণ বেকারত্বের চেয়ে বেশি, যা প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। সরকারি চাকরি সীমিত, বেসরকারি খাতে নিরাপত্তা কম, আর নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব তরুণদের আস্থা ভেঙে দিচ্ছে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি না পাওয়ার অভিজ্ঞতা একজন তরুণকে ভিতর থেকে ক্ষয় করে দেয়।
অনেকেই বছরের পর বছর চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেয়। একটি সরকারি পদের বিপরীতে যখন শত শত কিংবা হাজারো আবেদনকারী প্রতিযোগিতা করে, তখন ব্যর্থতা স্বাভাবিক হলেও মানসিক চাপ অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছে যায়। বয়স বাড়ে, সংসারের চাপ বাড়ে, কিন্তু সাফল্য আসে না। একসময় সে নিজেকেই দায়ী করতে শুরু করে আমি কি ব্যর্থ? আমি কি অযোগ্য? এই আত্মদোষারোপ থেকেই জন্ম নেয় গভীর হতাশা।
এই হতাশা শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিকও। সমাজে এখন সফলতার একটি সংকীর্ণ সংজ্ঞা তৈরি হয়েছে। ভালো চাকরি, ভালো আয়, সামাজিক মর্যাদা এই মানদণ্ডে যারা পিছিয়ে পড়ে, তারা অবহেলিত হয়। বিভিন্ন সামাজিক গবেষণায় দেখা যায়, বেকার তরুণদের প্রায় ৬০ শতাংশ নিজেকে পরিবার ও সমাজের কাছে ‘বোঝা’ মনে করে। আত্মীয়দের প্রশ্ন, প্রতিবেশীর কটাক্ষ, সামাজিক তুলনা সব মিলিয়ে একজন তরুণ নিজেকে মূল্যহীন মনে করতে শুরু করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। গবেষণা বলছে, দৈনিক তিন ঘণ্টার বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা তরুণদের মধ্যে হতাশা ও আত্মবিশ্বাসহীনতার প্রবণতা প্রায় দ্বিগুণ। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে সবাই যেন সুখী, সফল এবং স্থিতিশীল। বাস্তবে যা নয়, সেটাকেই মানুষ সেখানে প্রদর্শন করে। কিন্তু একজন হতাশ তরুণ এসব দেখে ভাবে সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু আমি পিছিয়ে আছি। এই তুলনা মানসিক চাপকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো দিকনির্দেশনার অভাব। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৭৫ শতাংশ তরুণ কখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং পায়নি। আমাদের সমাজে তরুণদের ক্যারিয়ার, জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা খুব কম হয়। পরিবার অনেক সময় ভালো চাইলেও বাস্তবতা বোঝে না। “আমাদের সময় তো এমন ছিল না” এই বাক্যটি দিয়ে অনেক সমস্যাকে হালকা করে দেখা হয়। কিন্তু সময় বদলেছে, চ্যালেঞ্জও বদলেছে।
ফলে অনেক তরুণ একা হয়ে যায়। তার কথা শোনার কেউ থাকে না, বুঝতে চাওয়ার মানুষও কম। মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত গবেষণা অনুযায়ী, তরুণদের প্রায় ৩৫–৪০ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র হতাশার উপসর্গে ভোগে, যদিও খুব অল্প সংখ্যকই পেশাদার সাহায্য নেয়। এই একাকিত্ব থেকেই কেউ কেউ চরম হতাশার দিকে ধাবিত হয়, যা কখনো কখনো আত্মবিনাশী সিদ্ধান্তেও রূপ নেয়। এটি শুধু ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়, এটি সমাজের সম্মিলিত ব্যর্থতা।
তবে প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী?
প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। শুধু ভালো ফল নয়, শিক্ষার্থীরা কী শিখছে এবং তা কীভাবে কাজে লাগাতে পারছে, সেটাই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানে স্বচ্ছতা ও বৈচিত্র্য আনতে হবে। সব তরুণের জন্য সরকারি চাকরিই একমাত্র স্বপ্ন হওয়া উচিত নয়। উদ্যোক্তা হওয়া, প্রযুক্তিনির্ভর কাজ, সৃজনশীল পেশা এসব ক্ষেত্রকে সামাজিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
তৃতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা দরকার। হতাশ হওয়া দুর্বলতা নয়এই বার্তাটি সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে এ বিষয়ে দায়িত্ব নিতে হবে।
সবশেষে, তরুণদের নিজেদের প্রতিও একটি অনুরোধ। জীবন একটি দীর্ঘ যাত্রা। একটি বা দুটি ব্যর্থতা আপনাকে সংজ্ঞায়িত করে না। নিজের পথ খোঁজার সময় নিজেকে সময় দিন, তুলনা থেকে দূরে থাকুন এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাইতে দ্বিধা করবেন না।
তরুণরা হতাশ হলে একটি দেশ শুধু আজ নয়, তার ভবিষ্যৎও হারায়। তাই তরুণদের হতাশা শুধু তাদের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি আমাদের জাতীয় সংকট। এখনই যদি আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে না ভাবি, তাহলে ক্ষতিটা হবে অপূরণীয়।
তৌসিফ রেজা আশরাফী
লেখক ও শিক্ষার্থী
সৈয়দপুর, নীলফামারী
