

বাংলাদেশের সমাজ বহুমাত্রিক। এখানে ধর্ম মানে শুধু মতবাদ নয়, জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও সম্পর্কের জাল। সুফিবাদী ধারার সঙ্গে এই দেশের মানুষের সম্পর্ক শত বছরের পুরোনো। আবার একই সমাজে জামায়াতে ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসেবে দীর্ঘকয়েক দশক ধরে সক্রিয়। অনেক সময় এই দুই ধারাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাস্তব রাজনীতি ও সামাজিক জীবনে চিত্রটি এত সরল নয়।
যেসব আসনে জামায়াতে ইসলামী জয়লাভ করেছে ও জনপ্রতিনিধিত্ব করবেন, সেখানে তাদের আচরণ বোঝার জন্য আগে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। জামায়াতে ইসলামী নিজেকে শুধু একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখে না, বরং একটি নৈতিক ও সামাজিক সংস্কারমূলক আন্দোলন হিসেবেও দেখে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তাদের আচরণ অনেক সময় ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। আবার অতীতে অনেক সময় অতি আবেগী কর্মীদের জন্য প্রশ্নবিদ্ধও হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী আদর্শগতভাবে কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক ইসলামি জীবনব্যবস্থার কথা বলে। এই অবস্থান থেকে তারা ধর্মীয় কিছু আচার নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে পারে। কিন্তু ভিন্নমত থাকা আর মানুষের সঙ্গে শত্রুতা করা এক জিনিস নয়। বাস্তবে জামায়াত বরাবরই বলে এসেছে, বিশ্বাসের প্রশ্নে যুক্তি ও দাওয়াত থাকবে, জোর বা বিদ্বেষ নয়।
সুফিবাদী গোষ্ঠির ক্ষেত্রে এই নীতিই প্রযোজ্য। জামায়াতের নেতৃত্ব বারবার স্পষ্ট করেছে, তারা কোনো মুসলমানের ঈমান বা নিয়ত নিয়ে ফতোয়া দিতে চায় না। মানুষ যে যার বিশ্বাস নিয়ে শান্তিতে থাকুক, এই সামাজিক সহাবস্থান তারা স্বীকার করে।
জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহারগুলো দেখলে একটি বিষয় চোখে পড়ে। সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোই মুখ্য। সুফিবাদী দরবার বা মাজারকেন্দ্রিক সংস্কৃতি নিয়ে আক্রমণাত্মক কোনো ভাষা সেখানে নেই।
এর কারণ খুব সাধারণ। জামায়াত জানে, রাষ্ট্র পরিচালনা মানে শুধু মতাদর্শিক বক্তব্য নয়, বরং নানা মতের মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তারা সবার জন্য কাজ করতে চায়, শুধু সমর্থকদের জন্য নয়।
যেসব এলাকায় জামায়াতের জনপ্রতিনিধিপ্রার্থী ছিলেন, সেখানে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। স্থানীয় মাজার, দরবার বা সুফিবাদী অনুষ্ঠানে তারা প্রশাসনিক বাধা দেওয়ার পথে যাননি, যদি সেখানে আইনশৃঙ্খলা বা জননিরাপত্তার ঝুঁকি না থাকে। বরং অনেক জায়গায় সামাজিক সমস্যা সমাধানে স্থানীয় সব পক্ষের সঙ্গে তারা বসেছেন।
কারণ জামায়াত বোঝে, সুফিবাদী দরবারগুলো শুধু ধর্মীয় স্থান নয়। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো এতিমখানা, লঙ্গরখানা, কিংবা সামাজিক সহায়তার কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে। এই মানবিক ভূমিকার প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল থাকতে চায়।
জামায়াতে ইসলামী বিশ্বাস করে দাওয়াত মানে মানুষকে অপমান করা নয়, বরং ভালো কথা সুন্দরভাবে বলা। তাদের মতে, যদি কোনো ধর্মীয় চর্চা নিয়ে ভিন্নমত থাকে, সেটা আলোচনা, লেখা বা সংলাপের মাধ্যমে হওয়া উচিত। গালাগালি, ভাঙচুর বা ভয় দেখানো ইসলামি আদর্শের সঙ্গে যায় না।
এই কারণেই দলীয়ভাবে জামায়াত সহিংসতা বা উসকানিমূলক আচরণকে সমর্থন করে না। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠি যদি ব্যক্তিগতভাবে বাড়াবাড়ি করে, সেটাকে পুরো দলের নীতি বলে ধরে নেওয়া ন্যায্য নয়।
আজকের বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক বেশি পর্যবেক্ষণের মধ্যে। গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক পরিসর সবই নজর রাখে। জামায়াতে ইসলামী এটুকু বোঝে যে দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি রাজনীতি সম্ভব নয়।
সুফিবাদী গোষ্ঠির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহনশীল আচরণ আসলে জামায়াতের রাজনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধেও নয়। বরং এটি সামাজিক শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ধর্মীয় সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করে, যা একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের জন্য জরুরি
সব মিলিয়ে বলা যায়, জামায়াতে ইসলামী যে সব আসনে নির্বাচিত হয়েছে, সেখানে সুফিবাদী গোষ্ঠির প্রতি তাদের আচরণ মূলত মানবিক, দায়িত্বশীল ও সহাবস্থানমুখী হওয়া উচিত । কারণ মতের ভিন্নতাকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের মাধ্যমে গণতন্ত্র বিকশিত হয়। আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও তারা বিশ্বাস করে, সমাজ চলবে পারস্পরিক সম্মান ও শান্তির ভিত্তিতে।
জামায়াতের রাজনীতি মানুষের বিরুদ্ধে নয়, মানুষের কল্যাণের জন্য। আর এই কল্যাণের পথে চলতে গেলে ভিন্নমতের মানুষকেও সঙ্গে নিয়ে চলতে হয়। এটাই তাদের ঘোষিত অবস্থান, এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় সেটারই প্রতিফলন দেখা যায়।
তৌসিফ রেজা আশরাফী
লেখক ও শিক্ষার্থী
সৈয়দপুর, নীলফামারী
