

এস এম আওলাদ হোসেন,সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
“আমার মতে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব কিশোর গ্যাংয়ের হাতেই তুলে দেওয়া উচিত”—কথাটি শুনতে ব্যঙ্গাত্মক। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা ও কিছু ভয়াবহ দৃশ্য দেখে একজন সাধারণ নাগরিকের মনে যদি এমন হতাশা জন্ম নেয়, সেটি নিছক রসিকতা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—রাষ্ট্রের আইন, প্রশাসনের কর্তৃত্ব এবং সামাজিক শৃঙ্খলা যদি একটি কিশোর গোষ্ঠীর দাপটের কাছে অসহায় মনে হয়, তাহলে আমরা কোন পথে এগোচ্ছি ?
সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ-সংলগ্ন ওয়েলকাম হাসপাতালের সামনে কয়েকজন এসএসসি পরীক্ষার্থী ও ভাঙ্গাখা এলাকার হৃদয় নামের এক তরুণকে নিয়ে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধরের একটি ঘটনা আমি প্রত্যক্ষ করেছি বলে বর্ণনা করছি। দীর্ঘ সময় একজন তরুণকে মারধরের পর সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে পাশের চায়ের দোকানে বসে সিগারেট খেতে দেখার দৃশ্যও আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
ঘটনাটির পূর্ণ সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও আইনি দায় অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু একজন নাগরিকের চোখে প্রকাশ্য স্থানে এ ধরনের আচরণ নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
প্রশ্ন হচ্ছে—কেউ অপরাধ করেছে কি না, তা নির্ধারণের অধিকার কার ?
কোনো কিশোর, তরুণ কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি কারও অপরাধের বিচার করতে পারে না। কাউকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ, শারীরিকভাবে মারধর, ভয় দেখানো কিংবা প্রকাশ্যে অপমান করার এখতিয়ারও কোনো ব্যক্তিগত গোষ্ঠীর নেই। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার করবে আদালত। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে একদিন ভুক্তভোগী যে কেউ হতে পারেন।
কিশোর মানেই অপরাধী নয়—তবে অপরাধ করলে আইনের আওতায় আসতেই হবে
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া মানে কিশোরদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। বরং অধিকাংশ কিশোরকে অপরাধের জগত থেকে রক্ষা করাই রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তিই শিশু। একই আইনে আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুর জন্য পৃথক বিচারব্যবস্থা, শিশুবিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তা, প্রবেশন কর্মকর্তা এবং বিকল্প পন্থার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ কোনো কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তাকে ছাড় দেওয়া হবে—আইন এমন কথা বলে না। আবার তাকে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীর মতো নির্বিচারে আচরণ করাও আইনসম্মত নয়। শিশু আইন, ২০১৩-এর ৪৮ ধারায় শিশুর পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক, মনস্তাত্ত্বিক ও শিক্ষাগত পটভূমি বিবেচনায় নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিচারের পরিবর্তে বিকল্প পন্থা (diversion) গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব—অপরাধ দমন করতে হবে, কিন্তু কিশোরকে অপরাধী বানিয়ে নয়; প্রয়োজন হলে তাকে সংশোধন ও পুনর্বাসনের পথেও নিতে হবে।
মারধর করে ‘বিচার’ করার সুযোগ নেই
কেউ অপরাধ করেছে বলে সন্দেহ হলেই তাকে প্রকাশ্যে মারধর করা কোনো আইনসম্মত পদ্ধতি নয়। আঘাতের মাত্রা ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা প্রযোজ্য হতে পারে। বাংলাদেশি আদালতের সাম্প্রতিক রায়গুলোতেও দণ্ডবিধির ৩২৩ ধারায় স্বেচ্ছায় আঘাত করার অপরাধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের উদাহরণ রয়েছে।
তাই কোনো ব্যক্তিকে “শিক্ষা দেওয়ার” নামে মারধর করা আসলে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা নয়; বরং আইনের শাসনের বিকল্প একটি বেআইনি ব্যবস্থা তৈরি করা।
আর এই প্রবণতা যদি সমাজে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে আগামী দিনে যে যার মতো করে “বিচার” করতে শুরু করবে। তখন আদালত, পুলিশ, প্রশাসন—সবকিছুর প্রয়োজনীয়তাই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
কিশোর গ্যাং হঠাৎ করে শূন্য থেকে তৈরি হয় না। এর পেছনে থাকে পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, মাদক ও অপরাধী চক্রের প্রভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধীসুলভ সংস্কৃতির অনুকরণ, বেকারত্ব, রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের প্রশ্রয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বড়দের অপরাধে কিশোরদের ব্যবহার।
ইউনিসেফের ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুযায়ী, ১–১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫.৭ শতাংশ গত মাসে কোনো না কোনো ধরনের সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। এই পরিসংখ্যান কিশোর অপরাধের সরাসরি পরিমাপ নয়; তবে শিশুদের বেড়ে ওঠার পরিবেশে সহিংসতার ব্যাপক উপস্থিতি যে উদ্বেগের বিষয়, তা স্পষ্ট।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব ও তাদের সঙ্গে অন্যান্য অপরাধের যোগসূত্রের বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যৌথ অভিযানে কিশোর গ্যাং সদস্যসহ ৫১ জনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছিল আইএসপিআর। তাদের কাছ থেকে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের কথাও জানানো হয়।
অতএব সমস্যাটিকে নিছক “ছেলেদের দুষ্টুমি” বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—অপরাধ সংঘটনের চেয়েও কখনো কখনো অপরাধের প্রতি সমাজের নীরবতা বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রকাশ্যে ধূমপান করছে—দেখেও আমরা পাশ কাটিয়ে যাই। রাস্তায় কিশোরদের দলবদ্ধ আড্ডা, হুমকি, বেপরোয়া আচরণ, মাদক কিংবা ছোটখাটো সহিংসতা—“এতে জড়ালে ঝামেলা হবে” ভেবে অনেকেই চুপ থাকেন।
এই নীরবতাই একসময় অপরাধীদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। আর যখন কোনো অপরাধী গোষ্ঠী মনে করে—“আমাদের কেউ কিছু করতে পারবে না”—তখন সেখান থেকেই শুরু হয় সামাজিক কর্তৃত্বের বিকল্প কেন্দ্র তৈরির প্রক্রিয়া।
কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে যদি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা স্থানীয় ক্ষমতার ছায়া থাকে, তাহলে শুধু কয়েকজন কিশোরকে আটক করে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং দেখতে হবে
কারা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে ?
কারা তাদের অপরাধের পর রক্ষা করছে ?
কারা অভিযোগ উঠলে নীরব থাকছে ?
রাষ্ট্রের আইন সবার জন্য সমান—এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে হলে অপরাধীর বয়স, পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক যোগাযোগ নয়; অপরাধের প্রকৃতি ও প্রমাণ বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশ পুলিশ নিয়মিত অপরাধ-পরিসংখ্যান প্রকাশ করে; ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাসভিত্তিক অপরাধ পরিসংখ্যানও তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
তবে কিশোর গ্যাং সমস্যার প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে সাধারণ অপরাধের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি বয়সভিত্তিক অপরাধ, পুনরাবৃত্তি, মাদক, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সংঘবদ্ধ অপরাধে কিশোরদের সম্পৃক্ততার পৃথক ও নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সমাধান কিশোর গ্যাংয়ের হাতে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব তুলে দেওয়া নয়; বরং আইনের কর্তৃত্ব তাদের ওপর কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করা।
প্রথমত, কোনো এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দেখা দিলে পুলিশকে দ্রুত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে মূল হোতাদের শনাক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কিশোর সদস্য ও প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষকদের আলাদা করে দেখতে হবে। শিশু আইনের বিধান অনুযায়ী কিশোরদের ক্ষেত্রে সংশোধন, পুনর্বাসন ও বিকল্প পন্থাকে কার্যকর করতে হবে।
তৃতীয়ত, স্কুল-কলেজ, পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, সাংবাদিক ও সামাজিক সংগঠনকে নিয়ে এলাকাভিত্তিক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
চতুর্থত, প্রকাশ্যে কিশোরদের মাদক গ্রহণ, ধূমপান, অস্ত্র প্রদর্শন, ভয়ভীতি বা মারামারির ঘটনা দেখলে “ঝামেলায় যাব না” নীতি পরিহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালীদের একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে—কিশোরকে ব্যবহার করে সাময়িক ক্ষমতা অর্জন করা যায়, কিন্তু তার পরিণতি শেষ পর্যন্ত সমাজকেই বহন করতে হয়।
আজ যদি একজন সাধারণ নাগরিককে ভাবতে হয়—“কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ে কোথাও প্রতিবাদ করা যাবে না”, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের ভয় নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্যও সতর্কবার্তা।
কিশোরদের হাতে ভবিষ্যৎ থাকার কথা, ভয় দেখানোর ক্ষমতা নয়। তাদের হাতে বই থাকার কথা, অস্ত্র নয়। তাদের মুখে স্বপ্নের কথা থাকার কথা, চাঁদাবাজি বা হুমকির ভাষা নয়।
আর কোনো নাগরিককে যেন এমন ব্যঙ্গাত্মক কথা বলতে না হয়—“আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব কিশোর গ্যাংয়ের হাতেই তুলে দেওয়া উচিত।”
সময় থাকতে পরিবারকে জাগতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব নিতে হবে, সমাজকে প্রতিবাদ করতে হবে, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নীরবতা ভাঙতে হবে এবং প্রশাসনকে দৃশ্যমানভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
কারণ আইনের শাসন দুর্বল হলে কিশোর গ্যাং শক্তিশালী হয়; আর কিশোর গ্যাং শক্তিশালী হলে শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে পুরো সমাজ।
