ঢাকা
প্রকাশিত : October 26, 2026
আপডেট: October 26, 2026
প্রকাশিত : October 26, 2026

সাঘাটায় দুই বিদ্যালয় সংলগ্ন অবৈধ টিএবি ইটভাটা,পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে দীর্ঘদিন ধরে!

আবু তাহের, স্টাফ রিপোর্টার ।।

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কামালেরপাড়া ইউনিয়নের নশিরারপাড়া (কাঁঠালতলী) এলাকায় লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই বহাল তবিয়তে চলছে টিএবি নামের একটি ইটভাটা।
মেসার্স তালুকদার একতা ব্রিকস নামের এ ইটভাটাটির কোয়ার্টার ও আধা কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও অন্যটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

প্রায় হাজারখানেক শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যঝুঁকি, বসতবাড়ি ও কৃষিজমির ওপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়টি সামনে এলেও ভাটাটি বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর বা জেলা-উপজেলা প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না এলাকাবাসীর। এমনটাই অভিযোগ।

সম্প্রতি সাঘাটা উপজেলার ছয়টি অবৈধ ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে চিমনি ভেঙে দেওয়া ও বিভিন্ন অর্থদণ্ডের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নশিরারপাড়ার তালুকদার একতা ব্রিকসের অনিয়মের বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান অভিযান না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অন্যান্য অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এ ভাটার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেন? তা নিয়ে জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

এই ইট ভাটাটির পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে পাওয়া কাগজপত্র ও সরেজমিন দেখা গেছে, ইটভাটাটির পাশে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ভাটাটি পরিচালনার প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি এবং এর পরিবেশগত ছাড়পত্রও নেই বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থী, স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষিজমির ওপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
শুধু তাই নয় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের পর ভাটাটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করার বিধি বা নিয়ম থাকলেও রহস্যজনক কারণে পল্লী বিদ্যুৎ ভাটাটিতে সংযোগ দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক কামাল হোসেন বলেন, “নশিরারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার সন্তান পড়ালেখা করে। ইটভাটার ধোঁয়া আর পাশ দিয়ে সার্বক্ষণিক ইট ও মাটিবাহী যান চলাচলের কারণে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যায় ভুগছে।”

একইভাবে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন এ প্রতিবেদক। তাঁরা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ইটভাটার ধোঁয়া, ধুলাবালি ও ভারী যানবাহনের চলাচলের কারণে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, ভাটাটির উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি। এর চারপাশে রয়েছে ফসলি ও আবাদি জমি। ফলে ইটভাটার কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ায় এনিয়ে সচেতন মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, ইটভাটার কারণে বিঘাপ্রতি ধানের ফলন চার থেকে পাঁচ মণ পর্যন্ত কমে যায় বলে তিনি মনে করেন। আরেক গৃহস্থ আরমান আলী বলেন, আমের মৌসুমে অজানা কারণে মুকুল ঝরে পড়ে এবং পঁচন রোগ দেখা দেয়। কৃষকদের এসব বক্তব্যে ইটভাটার কার্যক্রমের কারণে কৃষি উৎপাদনে সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি সামনে এসেছে।

সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মো. ইলতুতমিশ আকন্দ পিন্টু জানান, ইটভাটার ধোঁয়া ও ধুলাবালি মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এর কারণে হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরা বায়ুদূষণের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। দীর্ঘসময় দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে থাকলে কাশি, চোখ—নাক—গলায় জ্বালাপোড়া এবং শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

সাঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, ইটভাটার কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইটভাটার ধোঁয়া ও ধুলাবালি ফসলের পাতায় জমে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে পারে। এতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, ফুল—ফল ধারণ এবং ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি দূষণকারী পদার্থ মাটি ও পানিতে জমা হলে কৃষিজমির গুণগত মানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মেসার্স তালুকদার একতা ব্রিকসের বর্তমান মালিক মো. সালাউদ্দিন। তিনি বর্তমানে নশিরারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একদিকে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের দায়িত্ব, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত একটি ইটভাটার মালিকানা—বিষয়টি জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কীভাবে একই সঙ্গে এমন একটি ইটভাটার মালিকানা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে যে বিদ্যালয়ে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন, সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই যদি ইটভাটার ধোঁয়া ও ধুলাবালির সম্ভাব্য ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।

সরেজমিনে ইটভাটায় গিয়ে মালিককে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে মো. সালাউদ্দিন বলেন, “পরিবেশ ছাড়পত্রের আবেদন করা আছে। এ আবেদন দিয়েই ভাটাটি পরিচালনা করা হচ্ছে।” তিনি আরও দাবি করেন, “ভাটাটি পরিচালনায় শিক্ষার্থীদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।”

বিষয়টি নিয়ে গাইবান্ধা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আজাহারুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সাঘাটায় এ পর্যন্ত ছয়টি ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অর্থদণ্ড করা হয়েছে এবং চিমনি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তালুকদার একতা ব্রিকসে অভিযান চালানো হয়নি কেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সবগুলো অবৈধ ইটভাটায় অভিযান পরিচালনার জন্য যে সরঞ্জাম ও লোকবল দরকার, তা নেই।” এ সময় তিনি অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলার অনুরোধ জানান।

একই উপজেলায় ছয়টি ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হলেও নশিরারপাড়ার এই ইটভাটার বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় প্রশাসনের নজরদারি ও আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিকটবর্তী অবস্থান, পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার তথ্য এবং স্থানীয়দের স্বাস্থ্য ও কৃষিক্ষতির অভিযোগ—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।

সর্বশেষ
প্রকাশক ও সম্পাদক - সিকদার সাদেকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক- জাহিদুল হাসান জাহিদ
কার্যালয়ঃ ৪ দারুসসালাম রোড, মিরপুর, ঢাকা।
aazkaalbangla@gmail.com
মোবাইলঃ +8801842280000
আজকাল বাংলা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2021-2025 AjkalBangla.Com All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram