

এস এম আওলাদ হোসেন সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
রাজনীতিতে ক্ষমতা অর্জনের চেয়ে ক্ষমতার শৃঙ্খলা রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন। কারণ, ক্ষমতা মানুষকে দায়িত্বশীল করার পাশাপাশি কখনো কখনো বেপরোয়া ও আত্মবিশ্বাসীও করে তোলে। আর সেই আত্মবিশ্বাস যখন জবাবদিহির সীমা অতিক্রম করে, তখন ব্যক্তির কর্মকাণ্ড দল ও সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এমন বাস্তবতায় বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পর দুই জনপ্রতিনিধির পদত্যাগের ঘটনা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব, রাজনৈতিক কৌশল এবং দলীয় শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌস আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ এবং অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কে জড়ানোর পর প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ—দুটি ঘটনাই রাজনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই পদত্যাগগুলো কি নিছক ব্যক্তি-দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দলের নেতাকর্মীদের জন্য একটি কঠোর রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছেন? রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা কিংবা সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ব্যক্তি বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব কেবল ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তার দায় এসে পড়ে সংশ্লিষ্ট দল, সরকার এবং নেতৃত্বের ওপরও। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কর্মকাণ্ড যখন জনমনে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি করে, তখন নেতৃত্বের নীরবতা অনেক সময় প্রশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
এখানেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—দলের নেতাদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরা এবং সরকারের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখা। কারণ, জনগণ কেবল সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে নেতৃত্বের মূল্যায়ন করে না; তারা দেখতে চায়, ক্ষমতাসীনরা নিজেরা কতটা আইন মেনে চলেন এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠলে কতটা নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দুই ঘটনায় পদত্যাগের মধ্য দিয়ে যদি এই বার্তা দেওয়া হয়ে থাকে যে পদ-পদবি কাউকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত।
তবে সেই বার্তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। একজন মন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া এবং তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত অনিয়মের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কেবল জনমনে বিতর্ক তৈরি হলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। একইভাবে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ক্ষমতার প্রভাব কাজে লাগিয়ে কোনো অভিযোগকে উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
সুতরাং, প্রধানমন্ত্রী যদি বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে দ্রুত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চান, তাহলে অভিযোগের প্রকৃতি, প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাখ্যা বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। অন্যথায় পদত্যাগের ঘটনাগুলো সাময়িক রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলার কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রাজনীতিতে কঠোরতা প্রয়োজন, কিন্তু সেই কঠোরতা হতে হবে ন্যায়সংগত।
একজনের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর অন্যজনের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যের কারণে ছাড় দেওয়া হবে—এমন দ্বৈতনীতি জনগণের আস্থা বাড়ানোর বদলে কমিয়ে দেবে। প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। মাদক নির্মূলের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ় অবস্থান অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই অবস্থান বাস্তবায়নের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের। ইশরাক হোসেন প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, মাদক নিয়ে পুলিশকে জানিয়েও প্রতিকার পাননি।
তার এই বক্তব্য সত্য হলে তা আরও গুরুতর অনুসন্ধানের দাবি রাখে। প্রশ্ন ওঠে—অভিযোগ জানানোর পরও যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এর পেছনে কী কারণ ছিল? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, নাকি অন্য কোনো প্রভাব? এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান না করে কেবল একজন প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগে বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখলে মূল সমস্যার সমাধান হবে না। একই সঙ্গে অস্ত্র হাতে ব্যক্তিগতভাবে অভিযানে অংশ নেওয়াকে আইন প্রয়োগের বিকল্প হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করা যায় না। রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান ও বিধিবিধানের অধীনেই পরিচালিত হওয়া উচিত। অতএব, এখানে শুধু একজন প্রতিমন্ত্রীর আচরণ নয়, মাদক নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতাও পর্যালোচনার দাবি রাখে।
অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদের বক্তব্য অনুযায়ী, সর্বত্র নৈরাজ্যের পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী হয়তো ‘স্যাম্পল অ্যাকশন’ বা প্রতীকী ব্যবস্থা নিয়েছেন। এমন ব্যবস্থা দল ও সরকারের জন্য ইতিবাচক হতে পারে—যদি তা বৃহত্তর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। কিন্তু প্রতীকী পদক্ষেপ আর কার্যকর সংস্কার এক বিষয় নয়। প্রতীকী পদক্ষেপ জনমনে তাৎক্ষণিক বার্তা দেয়; আর সংস্কার প্রতিষ্ঠানের ভেতরে স্থায়ী পরিবর্তন আনে। পদত্যাগের মাধ্যমে সাময়িক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও প্রশাসনিক দুর্বলতা, দলীয় প্রভাব খাটানো, আইন প্রয়োগে বৈষম্য কিংবা জবাবদিহির ঘাটতি দূর না হলে একই ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।
তাই প্রয়োজন শুধু বিতর্কে জড়ানো ব্যক্তিদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়; প্রয়োজন অভিযোগ তদন্তের কার্যকর ব্যবস্থা, দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য সুস্পষ্ট আচরণবিধি, প্রশাসনের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা এবং অপরাধের ক্ষেত্রে পরিচয়-নির্বিশেষে আইন প্রয়োগ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন দুটি পথ। প্রথমটি হলো, বিতর্ক সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া এবং পরবর্তী সংকটের অপেক্ষায় থাকা।
দ্বিতীয়টি হলো, এসব ঘটনাকে শিক্ষা হিসেবে নিয়ে দল ও সরকারের ভেতরে জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। প্রথম পথ রাজনৈতিক সংকট কিছু সময়ের জন্য প্রশমিত করতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় পথই দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা অর্জনের সুযোগ তৈরি করবে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মনে রাখতে হবে, জনগণের ভোটে অর্জিত ক্ষমতা ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের লাইসেন্স নয়; এটি জনগণের কাছে জবাবদিহির অঙ্গীকার। আর প্রধানমন্ত্রীর জন্যও সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে—নিজ দলের মানুষের ক্ষেত্রেও আইনের শাসন ও নৈতিকতার প্রশ্নে আপস না করা। ফেরদৌস আহমেদ মিষ্টি ও ইশরাক হোসেনের পদত্যাগকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর বার্তা হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে। তবে এই বার্তা কতটা কার্যকর, তা নির্ধারিত হবে ভবিষ্যতের কর্মকাণ্ডে।
বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদত্যাগ যদি কেবল সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার সাময়িক কৌশল হয়, তাহলে তার প্রভাবও সাময়িক হবে। আর যদি তা দলীয় শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সূচনা করে, তাহলে সেটি হতে পারে ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি। কারণ, জনগণ শেষ পর্যন্ত কে পদত্যাগ করলেন, তা দিয়ে নয়—কে দায়বদ্ধ হলেন, কার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া হলো এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর হলো, তা দিয়েই সরকারের সাফল্য বিচার করবে। রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতা নয়, বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস অর্জনের একমাত্র পথ হলো—কথায় নয়, কাজে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা।
