ঢাকা
প্রকাশিত : October 20, 2026
আপডেট: October 20, 2026
প্রকাশিত : October 20, 2026

লক্ষ্মীপুরের উন্নয়ন খাতে দুর্নীতির অভিযোগ: বদলি নয়, চাই প্রকল্পভিত্তিক জবাবদিহিতা

উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, স্যানিটেশন, নদীতীর সংরক্ষণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ—জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এসব খাতে একের পর এক অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ, ঘুষ দাবি ও দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের প্রধানদের সাময়িক বরখাস্ত, স্ট্যান্ড রিলিজ কিংবা বদলির ঘটনাও ঘটেছে।

মাত্র এক মাসের ব্যবধানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কর্মকর্তাদের এমন পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে—লক্ষ্মীপুরের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটছে? সরকারি অর্থ ব্যয়ের তদারকি কি যথাযথভাবে হচ্ছে? প্রকল্প বাস্তবায়নের মান যাচাইয়ের দায়িত্ব যাঁদের হাতে, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল কয়েকজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকল্পভিত্তিক আর্থিক নিরীক্ষা, নির্মাণকাজের গুণগত মান যাচাই এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা।

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্দেশ্য জনগণের জীবনমান উন্নত করা। সড়ক নির্মাণ হলে মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার কথা, ড্রেন নির্মাণ হলে জলাবদ্ধতা কমার কথা, নদীতীর সংরক্ষণ হলে বসতভিটা ও ফসলি জমি ভাঙনের ঝুঁকি কমার কথা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন নির্মিত হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা। আর স্যানিটেশন প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলো স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের সুবিধা পাওয়ার কথা।

কিন্তু বরাদ্দের অর্থ ব্যয় হওয়ার পরও যদি কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা না পান কিংবা দরপত্র প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতের অভিযোগ দেখা দেয়, তাহলে উন্নয়নের প্রকৃত সুফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

উন্নয়নের সাফল্য কেবল কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে বা কতটি প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে—বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে কি না, নির্ধারিত মান বজায় রাখা হয়েছে কি না এবং জনগণ প্রকৃত সুবিধা পেয়েছেন কি না।

লক্ষ্মীপুরের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।

পিডিবির দুই কোটি টাকার কথোপকথন: প্রশাসনিক ব্যবস্থা কি যথেষ্ট ?

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে লক্ষ্মীপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল আমিনের আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত কথোপকথনের ভিডিও।

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাতে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “আমি দুই কোটি টাকার নিচে নেব না।” পরদিন ২৮ সেপ্টেম্বর পিডিবি তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং আনুষ্ঠানিক তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায়।

এ ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে ঠিকাদারের বিল ও মালামাল সরবরাহসংক্রান্ত বিষয়ও উঠে এসেছে। তবে ভিডিওতে আলোচিত অর্থের প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট লেনদেনের পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

কোনো কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত হলেই অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালে অনুমোদিত বিল, মালামাল সরবরাহ, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং প্রকল্পসংক্রান্ত আর্থিক সিদ্ধান্তে কোনো অনিয়ম ঘটেছে কি না।

বিদ্যুৎ খাতে অনিয়মের অভিযোগ শুধু একটি দপ্তরের সুনাম ক্ষুণ্ন করে না; এটি সরকারি সেবার ব্যয়, ঠিকাদারি কার্যক্রম এবং শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের স্বার্থের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

অতএব, এ ঘটনার তদন্ত যেন শুধু একজন কর্মকর্তার বক্তব্য বা আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সংশ্লিষ্ট নথি, অনুমোদন, বিল এবং আর্থিক লেনদেনের প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করাও জরুরি।

লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকার সড়ক সংস্কার ও ড্রেন নির্মাণকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও উদ্বেগজনক।

২০২৬ সালের ২০ জুলাই প্রকাশিত সংবাদে জাগো নিউজ ও কালবেলা জানায়, কাজের মান নিয়ে অভিযোগের পর পৌর কর্তৃপক্ষ অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে এবং তদারকির দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে চার কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে। প্রথমত, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত নকশা ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কাজ করেছে কি না। দ্বিতীয়ত, প্রকৌশলী ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা যথাযথভাবে কাজের মান পরীক্ষা করেছেন কি না।

নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ সত্য হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ড্রেনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে এবং একই অবকাঠামো মেরামতে ভবিষ্যতে আবার সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

এতে একবারের ত্রুটি পরবর্তী সময়ে দ্বিগুণ আর্থিক বোঝা তৈরি করতে পারে।

তাই এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কর্মকর্তাদের শোকজ কিংবা বদলির তথ্য প্রকাশ করলেই যথেষ্ট হবে না। স্বাধীন প্রকৌশলগত মূল্যায়নের মাধ্যমে কাজের বাস্তব অবস্থা, চুক্তিতে নির্ধারিত মান, পরিশোধিত বিল এবং প্রয়োজনীয় পুনর্নির্মাণের ব্যয় নির্ধারণ করা উচিত।

প্রকৃতপক্ষে যতটুকু কাজ হয়েছে, তার মূল্য কত এবং ত্রুটিপূর্ণ কাজ সংশোধনে কত টাকা লাগবে—এ হিসাবও জনগণের সামনে আসা দরকার।

লক্ষ্মীপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের টুইন পিট ল্যাট্রিন নির্মাণ প্রকল্পও নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রকল্পটির আওতায় সদর, রায়পুর ও রামগঞ্জ উপজেলায় ৯ হাজার ৩৮৯টি ল্যাট্রিন নির্মাণের পরিকল্পনার কথা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রকল্পের চার হাজার ল্যাট্রিনের বরাদ্দ বাতিল হওয়া, উপকারভোগীদের তথ্য ব্যবস্থাপনায় জটিলতা এবং ঠিকাদারদের বিল আটকে যাওয়ার বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে নির্মাণের মান ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন নিয়েও অভিযোগ উঠে আসে।

এ ধরনের প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা দরিদ্র পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তাই প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে প্রথমেই দেখতে হবে, প্রকৃত উপকারভোগীরা নির্ধারিত সুবিধা পেয়েছেন কি না। নির্মিত ল্যাট্রিনগুলো ব্যবহারযোগ্য কি না, নকশা ও নির্ধারিত উপকরণ অনুসরণ করা হয়েছে কি না, কাজের পরিমাণ অনুযায়ী বিল পরিশোধ হয়েছে কি না এবং ত্রুটিপূর্ণ কাজ সংশোধন করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের নথিভিত্তিক উত্তর দরকার।

প্রকল্পের অর্থায়ন, বরাদ্দ, ঠিকাদার নির্বাচন, উপকারভোগীর তালিকা এবং কাজের মান যাচাইয়ের পুরো প্রক্রিয়া পরীক্ষা করা উচিত। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা বা ঠিকাদার নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যাঁদের দায়িত্ব ছিল, তাঁদের ভূমিকারও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, অভিযোগ উঠেছে বলেই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আগেভাগে দোষী ঘোষণা করা যায় না। তদন্তে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করতে হবে।

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ও রামগতি উপজেলার নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উদ্যোগগুলোর একটি। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং এর লক্ষ্য মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে উপকূলীয় জনপদ, বসতভিটা ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রক্ষা করা।

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জাগো নিউজের প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকল্পের অগ্রগতি, টেন্ডার ও রিটেন্ডার এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ দৃশ্যমান করার বিষয়ে অসন্তোষের কথা উঠে আসে।

এ প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় এর অগ্রগতি ও গুণগত মানের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। নদীভাঙন উপকূলীয় মানুষের জন্য শুধু জমি হারানোর বিষয় নয়; এটি বসতভিটা, কৃষি, যোগাযোগ, জীবিকা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে তার ক্ষতি শুধু আর্থিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করতে হয়। কাজের মান যথাযথ না হলে ভবিষ্যতে একই এলাকায় পুনরায় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

তবে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রত্যাশিত না হওয়ার পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতা, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, নকশাগত জটিলতা, ঠিকাদারি সমস্যা কিংবা অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা দরকার।

একই প্রকল্পে একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পরিবর্তনের ঘটনা প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও তদারকির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু শুধু বদলির ঘটনাকে অনিয়মের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

প্রয়োজন প্রকল্পটির শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি, ব্যয়, চুক্তি, কাজের মান এবং সময়সীমা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন। কোন অংশে কত কাজ সম্পন্ন হয়েছে, কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কী কারণে বিলম্ব হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের চুক্তিগত দায় কী—এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ ও সংস্কার সরাসরি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ খাতে দরপত্রের স্বচ্ছতা এবং নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লক্ষ্মীপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শ্রাবনী চক্রবর্ত্তীর বিরুদ্ধে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিলড কোটেশনের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দরপত্র নথি, কাজের অনুমোদন, প্রযোজ্য ক্রয়বিধি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ এবং সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কাজ দেওয়া হয়েছে বলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনিয়ম প্রমাণ করে না; দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট পদ্ধতিটি ওই কাজের জন্য বিধিসম্মত ছিল কি না এবং সব শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না।

যদি নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজ ভাগ করে দেওয়া বা প্রতিযোগিতা সীমিত করার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের বৈধতা পরীক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে কাজের মান, ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং ঠিকাদার নির্বাচনের প্রক্রিয়া যাচাই করা জরুরি।

শিক্ষার্থীদের জন্য নির্মিত ভবন বা অবকাঠামোর ক্ষেত্রে নিম্নমানের কাজের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই এই খাতে কোনো অভিযোগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

এখানেই লক্ষ্মীপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। একাধিক দপ্তরের প্রধানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তাঁদের কেউ সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন, কাউকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে, আবার কাউকে বদলি করা হয়েছে।

প্রশাসনিক ব্যবস্থা কখনো কখনো তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু বদলি বা দায়িত্ব পরিবর্তন নিজে থেকেই দুর্নীতির অভিযোগের নিষ্পত্তি নয়। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অন্যত্র চলে গেলেও আগের কর্মস্থলে তাঁর দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া সিদ্ধান্ত, অনুমোদন করা বিল কিংবা তদারকি করা প্রকল্পের হিসাব অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে। তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত-কর্মকর্তা চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর দায়িত্বকালে সম্পন্ন হওয়া কাজগুলোর কী হবে ?

প্রকল্পের কাজ যদি মানসম্মত হয়ে থাকে, নির্ধারিত অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হয়ে থাকে এবং অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না থাকে, তাহলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া উচিত। আর যদি অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তাহলে শুধু বদলি দিয়ে বিষয়টি শেষ করা যাবে না। প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। কোনো প্রকল্পে একাধিক স্তরে অনুমোদন, তদারকি ও বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া থাকলে পুরো শৃঙ্খল পরীক্ষা না করে শুধু একজন কর্মকর্তার ওপর সব দায় চাপানো যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি অন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রকল্পভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা। সংশ্লিষ্ট পাঁচটি দপ্তরের কর্মকর্তাদের দায়িত্বকালে বাস্তবায়িত ও চলমান গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর আর্থিক নথি, কাজের পরিমাণ, বিল, চুক্তি ও অনুমোদন যাচাই করা দরকার। অভিযোগের মাত্রা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিরীক্ষার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যেতে পারে।

স্বাধীন প্রকৌশলগত মূল্যায়ন। সড়ক, ড্রেন, ল্যাট্রিন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন এবং নদীতীর সংরক্ষণকাজের নমুনা পরীক্ষা ও সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে নির্ধারিত মানের সঙ্গে বাস্তব কাজের তুলনা করতে হবে।

দরপত্রের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কোন প্রতিষ্ঠান কী শর্তে কাজ পেয়েছে, অনুমোদিত ব্যয় কত, চুক্তির মেয়াদ কত এবং কাজের অগ্রগতি কী—এসব তথ্য প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য করা উচিত।

অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত। দুর্নীতি দমন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারের মধ্যে থাকা অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। তদন্তের ফলাফল ও গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে আইনসঙ্গত সীমার মধ্যে জনসাধারণকে অবহিত করা দরকার।

 সরকারি ক্ষতির হিসাব নির্ধারণ। কোনো কাজে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, নিম্নমানের নির্মাণ কিংবা অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে হবে। প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী অর্থ পুনরুদ্ধার এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা রক্ষা। কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চললেও জরুরি জনসেবা ও উন্নয়নকাজ যেন বন্ধ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শূন্য পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ, প্রকল্পের নথি হস্তান্তর এবং চলমান কাজের তদারকি অব্যাহত রাখা জরুরি।

লক্ষ্মীপুরের উন্নয়ন খাত নিয়ে সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোকে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা হিসেবে দেখার আগে পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো খতিয়ে দেখা দরকার। অভিযোগগুলোর সবই শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হবে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো যাবে না। কিন্তু একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও দপ্তরকে ঘিরে প্রশ্ন ওঠার পর নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।

জনগণের করের টাকা কিংবা সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দ কোনো কর্মকর্তা, ঠিকাদার বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের উপায় হতে পারে না। প্রতিটি টাকার বিপরীতে কাজের হিসাব থাকতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পে মান নিশ্চিত করতে হবে। আর প্রতিটি অনিয়মের অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে হবে প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে।

লক্ষ্মীপুরের নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পে সময়মতো কাজ শেষ হওয়া, পৌরসভার সড়ক ও ড্রেনের স্থায়িত্ব, দরিদ্র পরিবারের স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনপ্রাপ্তি, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ভবন এবং বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছ সেবা—এসবই উন্নয়নের বাস্তব ফলাফল।

কর্মকর্তা বদলি হলে নতুন কর্মকর্তা আসবেন, দপ্তরের চেয়ার পূরণ হবে। কিন্তু নিম্নমানের কাজের ক্ষতি, সরকারি অর্থের অপচয় কিংবা অনিয়মের অভিযোগের নিষ্পত্তি না হলে জনগণের আস্থা ফিরবে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর লক্ষ্মীপুর সভাপতি মো. কামাল হোসেনসহ স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে প্রকল্পভিত্তিক নিরীক্ষা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার যে দাবি জানানো হয়েছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশিত।

লক্ষ্মীপুরের উন্নয়ন খাতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বদলির ধারাবাহিকতা নয়, জবাবদিহির ধারাবাহিকতা। অভিযোগের তদন্ত, প্রকল্পের নিরীক্ষা, সরকারি অর্থের সুরক্ষা এবং প্রমাণিত অনিয়মের বিচার—এই চারটি বিষয় নিশ্চিত হলেই জনগণ বুঝতে পারবেন, উন্নয়নের নামে ব্যয় হওয়া অর্থ সত্যিকার অর্থে তাঁদের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না।

কারণ, সরকারি দপ্তরে কে বসে আছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—জনগণের অর্থে নির্মিত সড়ক কত দিন টিকে থাকে, নদীর বাঁধ কতটা সুরক্ষা দেয়, বিদ্যালয়ের ভবন কতটা নিরাপদ এবং সরকারি সেবা পেতে নাগরিককে কতটা হয়রানির শিকার হতে হয়। লক্ষ্মীপুরের মানুষ এখন এসব প্রশ্নের স্পষ্ট, তথ্যভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক উত্তর প্রত্যাশা করেন।

এস এম আওলাদ হোসেন।

সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সর্বশেষ
প্রকাশক ও সম্পাদক - সিকদার সাদেকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক- জাহিদুল হাসান জাহিদ
কার্যালয়ঃ ৪ দারুসসালাম রোড, মিরপুর, ঢাকা।
aazkaalbangla@gmail.com
মোবাইলঃ +8801842280000
আজকাল বাংলা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2021-2025 AjkalBangla.Com All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram