

এস এম আওলাদ হোসেন, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
একটি পত্রিকার নীতি-নির্ধারণী প্রবন্ধই হলো সম্পাদকীয়। সংবাদপত্রের অন্যান্য সংবাদ যেখানে ঘটনা ও তথ্যকে পাঠকের সামনে তুলে ধরে, সম্পাদকীয় সেখানে সেই ঘটনা, সমস্যা ও নীতিগত বিষয়কে বিশ্লেষণ করে পত্রিকার অবস্থান, মতামত ও দিকনির্দেশনা প্রকাশ করে। ফলে সম্পাদকীয় লেখা শুধু ভাষার কারুকার্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ, বস্তুনিষ্ঠতা ও নৈতিকতার প্রশ্ন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, মফস্সলের অনেক সংবাদপত্রে সম্পাদকীয় পদে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা কিংবা নীতি-নির্ধারণী লেখার সক্ষমতার যথাযথ চর্চা না থাকলেও বাহ্যিক ভাবসাব দেখে তা বোঝার উপায় থাকে না। যোগ্য-অযোগ্য নির্বিশেষে সবাই যখন একই মাপকাঠিতে ‘সম্পাদক’ হিসেবে পরিচিতি পান, তখন সম্পাদকীয়র মান ও সংবাদপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা—দুটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সম্পাদকীয় মূলত দুই ধরনের
০১. শীর্ষ সম্পাদকীয়:
পত্রিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে পত্রিকার নীতিগত অবস্থান তুলে ধরে শীর্ষ সম্পাদকীয় লেখা হয়। এর বিষয় নির্বাচন ও বক্তব্যে থাকে বিশেষ গুরুত্ব।
০২. সাধারণ সম্পাদকীয়:
সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনা, স্থানীয় ও জাতীয় সমস্যা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সামাজিক অসঙ্গতি কিংবা জনদুর্ভোগ নিয়ে তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত পরিসরে বিশ্লেষণ ও মতামত প্রকাশ করা হয় সাধারণ সম্পাদকীয়তে।
সম্পাদকীয় লেখার মূল উদ্দেশ্য কী ?
একটি দায়িত্বশীল সম্পাদকীয়র কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য রয়েছে—
প্রথমত, জাতীয় ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করা।
সমস্যাটি কোথায়, এর গভীরতা কতটুকু এবং এর প্রভাব জনগণ ও রাষ্ট্রের ওপর কী—তা তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জনগণ ও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
কোনো সমস্যা দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকলে সম্পাদকীয়র মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো যেতে পারে।
তৃতীয়ত, ভুল নীতি ও সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করা।
কোনো সরকারি, রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জাতীয় জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে হলে সম্পাদকীয়তে যুক্তিনির্ভর সমালোচনা ও সতর্কবার্তা থাকা প্রয়োজন।
চতুর্থত, একই ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধে সচেতনতা সৃষ্টি করা।
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া একটি দায়িত্বশীল সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সম্পাদকীয় সেই শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
পঞ্চমত, ভুল সংশোধনের পথ দেখানো।
শুধু সমস্যার সমালোচনা করলেই সম্পাদকীয়র দায়িত্ব শেষ হয় না। সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান, করণীয় এবং বাস্তবসম্মত বিকল্প পথও তুলে ধরতে হয়।
একটি ভালো সম্পাদকীয়তে কী থাকা প্রয়োজন ?
একটি কার্যকর সম্পাদকীয় লেখার ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট থাকা উচিত—
০১. কোথায় এবং কীভাবে ভুল হচ্ছে ?
ঘটনার প্রকৃতি, সিদ্ধান্তের দুর্বলতা কিংবা সমস্যার উৎস নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
০২. কেন বা কী কারণে ভুলটি হচ্ছে ?
শুধু অভিযোগ নয়; সমস্যার পেছনের কারণ, প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে হবে।
০৩. কীভাবে তা রোধ বা সংশোধন করা যায়?
সমস্যা সমাধানের বাস্তবসম্মত পথ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের করণীয় এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে হবে।
সম্পাদকীয় কি ব্যক্তিগত আক্রমণের জায়গা ?
অবশ্যই নয়। সম্পাদকীয় কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক পক্ষকে হেয় করার মাধ্যম হতে পারে না। এটি হওয়া উচিত তথ্যনির্ভর, যুক্তিনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক।
সমালোচনা থাকবে, কিন্তু তা হবে যুক্তির ভিত্তিতে; মতামত থাকবে, কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত বিদ্বেষে পরিণত না হয়।
বিশেষ করে মফস্সলের সংবাদপত্রে সম্পাদকীয়র দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয় পর্যায়ে সংবাদপত্র শুধু সংবাদ প্রকাশ করে না; অনেক সময় জনমত গঠন, প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের সমস্যাকে সামনে তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাই সম্পাদক হওয়া আর সম্পাদকীয় লেখার যোগ্যতা অর্জন করা—এক বিষয় নয়। একটি পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতার মান নির্ভর করে সম্পাদকের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, পাঠাভ্যাস, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, নৈতিকতা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতার ওপর।
মফস্সলের সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় আরও শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে ব্যক্তিগত মতের পরিবর্তে তথ্য, যুক্তি, অনুসন্ধান ও দায়িত্বশীল বিশ্লেষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ একটি ভালো সম্পাদকীয় শুধু পাঠককে একটি মত দেয় না—পাঠককে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং সমাধানের পথ খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করে
