

বিশেষ প্রতিনিধি, সৈয়দপুর (নীলফামারী):
শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদানের চরম অবহেলা, একাডেমিক তদারকির অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার সাতপাই উচ্চ বিদ্যালয়ের ফলাফলে নজিরবিহীন ধস নেমেছে। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে গত চার বছরের এসএসসি পরীক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার গুণগত মান আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে বিদ্যালয়টিতে পাসের হার ছিল ৭৪.১৪ শতাংশ, সর্বশেষে ২০২৬ সালের প্রকাশিত ফলাফলে তা একাল-সেকাল তফাৎ হয়ে মাত্র ৩২.০০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে অর্ধেকেরও বেশি পাসের হার ধসে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানে সহকারী প্রধান শিক্ষক থাকার পরেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একজন সহকারি শিক্ষককে দায়িত্ব দেয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানির বিপর্যয় শুরু।
তথ্যমতে, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে মোট ৭৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তবে তাদের মধ্যে মাত্র ২৪ জন পাস করতে পারলেও অকৃতকার্য হয়েছে ৫১ জন শিক্ষার্থী। দীর্ঘ চার বছরে বিদ্যালয়টি থেকে কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ (GPA 5) অর্জনে সক্ষম হয়নি, যা প্রতিষ্ঠানের সার্বিক শিক্ষাদানের মান নিয়ে তীব্র প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গত ২০২৩ সালে বিদ্যালয়ে মোট পাসের হার ৭৪.১৪% থাকলেও সহকারী শিক্ষক মোঃ আব্দুল হাকিম দ্বায়িত্ব গ্রহনের পর থেকে অর্থাৎ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তা কমে যথাক্রমে ৪৬.১৫% ও ৪৬.৮৮%-এ নেমে আসে। তবে ২০২৬ সালে তা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়ে ৩২.০০%-এ দাঁড়ায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মানবিক বিভাগে চলতি বছর ৩৬ জনের মধ্যে ২৯ জনই (৮০.৫৬%) ফেল করেছে।”
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাতপাই উচ্চ বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগটি কার্যত ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালে মানবিক বিভাগে পাসের হার ছিল ৬৫.৬৩% (৩২ জনে ২১ জন পাস)। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৩.৯০%-এ এবং ২০২৫ সালে ৩২.৫০%-এ। তবে ২০২৬ সালের ফলাফল প্রকাশ হতেই চোখ ছানাবড়া অভিভাবকদের—এ বছর মানবিক বিভাগের ৩৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৯ জনই অকৃতকার্য হয়েছে! মাত্র ৭ জন পরীক্ষার্থী পাস করায় এ বিভাগে পাসের হার ঠেকেছে অবিশ্বাস্য ১৯.৪৪ শতাংশে।
একসময় বিজ্ঞান বিভাগের ফলাফল তুলনামূলক ভালো হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেখানেও অমার্জনীয় ধস দেখা গেছে। ২০২৩ সালে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ছিল ৮৪.৬২% এবং ২০২৪ সালে ছিল ৮০.০০%। ২০২৫ সালে পাসের হার ৬৮.০০% থাকলেও প্রতিষ্ঠানে একমাত্র সে বছরই ২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করে। কিন্তু ২০২৬ সালের ফলাফলে দেখা যায়, বিজ্ঞানের ৩৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২২ জনই ফেল করেছে এবং পাস করেছে মাত্র ১৭ জন। অর্থাৎ পাসের হার অর্ধেকেরও নিচে (৪৩.৫৯%) নেমে এসেছে।
টানা চার বছর ধরে একটি বিদ্যালয়ের ফলাফলের এমন আশঙ্কাজনক অধঃপতনে স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকমণ্ডলীর চরম গাফিলতি, শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদানের বদলে দায়িত্বহীনতা, প্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণ ক্লাস করার আগে ছুটি প্রদান, দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা না করা এবং পরিচালনা পর্ষদের (ম্যানেজিং কমিটি) তদারকিবহীন উদাসীনতাই এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ।
এবিষয়ে সাবেক এক সভাপতি বলেন, স্কুলে নিয়মিত ক্লাস হয় না, আমি থাকা অবস্থায় স্কুলের পাশের হার ছিলো সন্তোষজনক। তবে সহকারী শিক্ষক মোঃ আব্দুল হাকিম দ্বায়িত্ব নেয়ার পর থেকে স্কুলের অবনতি শুরু হয় যা আজ তলানিতে।
রেজাল্ট এর বিষয়ে বর্তমান প্রতিষ্ঠান প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ আব্দুল হাকিম এর সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি ব্যস্ত অছেন, পরে কথা হবে বলে মোবাইল এর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
স্থানীয় সুশীল সমাজের দাবি, অবিলম্বে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কর্তৃক একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে সাতপাই উচ্চ বিদ্যালয়ের এই চরম একাডেমিক ব্যর্থতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।
