

আবু তাহের, গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কামালেরপাড়া ইউনিয়নে অবাধে বৃক্ষ নিধন ও লোকালয়ে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির মহোৎসব চলছে।
এতে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ, বিপন্ন হচ্ছে জনস্বাস্থ্য। উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ কয়লার চুল্লি গুঁড়িয়ে দিলেও অজ্ঞাত কারণে কয়েকদিনের মধ্যেই তা আবার মেরামত করে সচল করা হচ্ছে।
প্রশাসনের এই ‘ভাঙা-গড়ার’ খেলায় স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে সুধীসমাজ ও এলাকাবাসীর মনে।অনুসন্ধানে জানা গেছে, কামালেরপাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে বাঙাবাড়ি, কিংকরপুর, কাঁঠালতলির লোকালয় ও ফসলি জমির পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে এসব অস্থায়ী কয়লা তৈরির চুল্লি। ইটের তৈরি বিশেষ এই চুল্লিগুলোতে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা কাঠ পোড়ানো হচ্ছে।কয়লা তৈরির মূল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ।
প্রতিদিন শত শত মণ সবুজ বৃক্ষ কেটে সাবাড় করা হচ্ছে, যা এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য ধ্বংস করছে। চুল্লিগুলো থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় চারপাশের আকাশ সবসময় আচ্ছন্ন থাকে। এর ফলে তীব্র শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি, চোখের সমস্যায় ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও বৃদ্ধরা।বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে ধানের শীষ পুড়ে গেছে , ফলদ গাছের ফল অকালে ঝরে পড়ছে এবং মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন মাঝেমধ্যেই এসব অবৈধ কয়লার কারখানায় ভাঙনের অভিযান চালায়। এমনকি চুল্লিগুলো ভেঙে গুঁড়িয়েও দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই এক অদৃশ্য ইশারায় আবারও তৈরি হয় সেই চুল্লি।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা সরেজমিন বার্তা প্রতিনিধিকে জানান " মাঝে মাঝে সাঘাটা উপজেলা প্রশাসন এসে চুল্লি ভেঙে দিয়ে যায়, আমরা ভাবি এবার বুঝি আমরা রক্ষা পেলাম। কিন্তু দু'দিন পর দেখি আবার কাঠ এসে জমা হচ্ছে আর চুল্লি মেরামত করা হচ্ছে।
এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে আইনকে তারা পাত্তাই দেয় না। এর পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো রহস্য বা লেনদেন আছে।"তারা আরো অভিযোগ করেন, প্রশাসন এসে শুধু চুল্লী গুলোর কিছু ইট খুলে ভেঙে দিয়ে যায়। তেমন কোনো জরিমানা করে না। চুল্লি মালিকদের মোটা অংকের জরিমানা না করার কারণেই অবৈধ কয়লা ব্যবসায়ীরা দুচারদিন যেতে না যেতেই আবার কাঠ পোড়ানো শুরু করে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, আবাসিক এলাকা, ফসলি জমি বা বনাঞ্চলের কাছাকাছি এ ধরনের চুল্লি স্থাপন সম্পূর্ণ অবৈধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।
এছাড়া লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনোভাবেই কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করা যাবে না। সাঘাটার এই চুল্লিগুলোর একটিরও কোনো বৈধ অনুমতি নেই।সাঘাটায় পরিবেশের এই বিপর্যয় রুখতে কেবল ‘লোকদেখানো’ বা সাময়িক অভিযান কোনো কাজে আসছে না। পরিবেশবিদ ও সচেতন মহলের মতে, কামালেরপাড়া ইউনিয়নকে বাঁচাতে হলে এখনই কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:অনেকেই বলেন, শুধু চুল্লি ভেঙে দেওয়া নয়, কয়লা তৈরির সরঞ্জাম ও কাঠ সম্পূর্ণ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। মোটা অংকের জরিমানা করতে হবে। চুল্লি মালিক ও এর পেছনের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করে গ্রেপ্তার নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসন চলে যাওয়ার পর যাতে পুনরায় চুল্লি স্থাপন না হয়, সেজন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও চৌকিদারদের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। সাঘাটার সবুজ প্রকৃতি এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন ও জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর আর কোনো ‘রহস্যজনক’ নীরবতা না দেখিয়ে দ্রুত চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর।
এব্যাপারে সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে কথা বললে তিনি জানান,পরিবেশ অধিদপ্তরকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর চাইলে ম্যাজিষ্টেসি সহায়তা দেয়া হবে। সেই সাথে অবৈধ চুল্লী মালিকদের বিরুদ্ধে এবার মামলা করা হবে বলে পরিবেশ অধিদপ্তর উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছে। কিন্তু এখনো অভিযান পরিচালনা করতে আসেনি।
