

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে চীনকে ঘিরে বিশ্বশক্তিগুলোর সক্রিয়তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের চীন সফরকে বিশ্লেষকরা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরগুলো দেখাচ্ছে যে বিশ্ব ধীরে ধীরে একমেরু প্রভাব থেকে বহুমেরু শক্তি কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিপরীতে চীন ও রাশিয়া নতুন বিকল্প শক্তি কেন্দ্র গড়ে তুলছে। একই সঙ্গে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে চীনের গুরুত্ব এতটাই বেড়েছে যে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোকেও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে হচ্ছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সফরে চীন-রাশিয়া সম্পর্ককে “কৌশলগত অংশীদারত্ব” হিসেবে তুলে ধরা হয়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা এবং বিকল্প অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরিতে দুই দেশ আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের সফর বা চীনমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও চীনের গুরুত্ব স্পষ্ট করেছে। বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে চীনকে উপেক্ষা করা এখন আর সহজ নয়।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সফর মূলত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC), বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু সফরের মূল আলোচনায় ছিল। একই সঙ্গে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠতার ভারসাম্য রক্ষায় পাকিস্তান চীনের সমর্থন আরও জোরালো করতে চাইছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে এই পরিস্থিতিকে নতুন মেরুকরণের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপভিত্তিক জোট, অন্যদিকে চীন-রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা এবং এর মাঝখানে বহু দেশ এখন “মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট” বা বহুমুখী কূটনীতির পথে হাঁটছে। ভারত, সৌদি আরব, তুরস্কসহ অনেক দেশই এখন একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মেরুকরণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে মধ্যপ্রাচ্য ও ইরান ইস্যুতে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। বিপরীতে চীন ইরানের জ্বালানি সম্পদ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ধরে রাখতে আগ্রহী। রাশিয়াও ইরানকে পশ্চিমবিরোধী কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে। ফলে ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতি আরও জটিল হতে পারে।
এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উচিত কোনো একক বলয়ের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা। চীনের বিনিয়োগ, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার, ভারতের ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার—সব দিক বিবেচনায় রেখে বাস্তববাদী কূটনীতি অনুসরণ করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
তাদের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের জন্য “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” নীতিকে আরও কৌশলগত ও আধুনিকভাবে প্রয়োগ করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সক্রিয়তা বাড়ানো ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সাদেকুর রহমান
সম্পাদক
আজকাল বাংলা
