

এস এম আওলাদ হোসেন সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, পরিকল্পিত হামলা এবং প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে। কখনো ব্যস্ত বাজারে, কখনো কর্মস্থলে, আবার কখনো বসতবাড়িতে ঢুকে চালানো হচ্ছে প্রাণঘাতী হামলা। সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ নাগরিক—পরিস্থিতিভেদে কেউই নিরাপত্তার প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু হত্যাকাণ্ডের ধরন দেখে পরিকল্পিত অপরাধের আশঙ্কা তৈরি হলেও অনেক ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও নেপথ্যের শক্তি এখনো তদন্তের বিষয়। প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর? অপরাধীরা কীভাবে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর সাহস পায় ? আর হত্যাকাণ্ডের পর বিচার নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়ে কেন বারবার প্রশ্ন ওঠে ? বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিশ্লেষণে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ। দ্য ডেইলি স্টার ১৬ জুন ২০২৬-এ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের বরাতে জানায়, ওই বছরের মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল।
একই সময়ের ২০২৫ সালের তুলনীয় হিসাবে মামলা ছিল ৭৬৭টি এবং ২০২৪ সালে ছিল ৭৯৪টি। প্রতিবেদনটিতে রাজনৈতিক বিরোধ, অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্ব এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তারকে সহিংসতার উদ্বেগজনক প্রেক্ষাপট হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ১৯ অক্টোবর ২০২৬-এ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তুলনামূলক পরিসংখ্যানের বরাতে জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হত্যা মামলা ছিল ২ হাজার ৬৫৯টি; আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯১৩টি। অর্থাৎ, নথিভুক্ত হত্যা মামলার সংখ্যা ৮ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। এই দুই তথ্য পাশাপাশি রাখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়: সামগ্রিকভাবে হত্যা মামলার সংখ্যা কমার তথ্য থাকলেও নির্দিষ্ট এলাকায় সংঘটিত প্রকাশ্য গুলির ঘটনা, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং অপরাধীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে উদ্বেগকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে সব হত্যাকাণ্ডই যে টার্গেট কিলিং, তা বলা যাবে না। টার্গেট কিলিংয়ের প্রকৃত প্রবণতা বুঝতে হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য, অপরাধের ধরন, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং তদন্তের ফলাফল আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
একটি হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন, আলামত সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস শনাক্ত করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে শুধু সরাসরি হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করলেই তদন্তের দায়িত্ব শেষ হয় না। হত্যার নির্দেশদাতা, পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা কিংবা অপরাধে সহায়তাকারী কেউ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সাক্ষী ও ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভয়ভীতি বা প্রভাব বিস্তারের কারণে তদন্ত বাধাগ্রস্ত না হয়। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অস্ত্রের সরবরাহপথ শনাক্ত, অপরাধী চক্রের আর্থিক লেনদেন অনুসন্ধান এবং আন্তজেলা অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান জরুরি। তবে এসব পদক্ষেপ হতে হবে আইনসম্মত, প্রমাণনির্ভর ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। নাগরিকের প্রথম প্রত্যাশা নিরাপত্তা।
একজন মানুষ যেন কর্মস্থলে যেতে, ব্যবসা পরিচালনা করতে, সংবাদ সংগ্রহ করতে কিংবা রাজনৈতিক মত প্রকাশ করতে গিয়ে প্রাণ হারানোর আশঙ্কায় না থাকেন—এটাই একটি কার্যকর রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এজন্য সরকারের জরুরী ১. ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা: যেখানে ধারাবাহিক গুলি, হত্যাকাণ্ড বা সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে, সেখানে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা। ২. অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর অভিযান: অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের উৎস, পরিবহন ও ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া। ৩. হত্যা মামলার অগ্রগতি প্রকাশ: গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তদন্তের অগ্রগতি, গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আইনসম্মত সীমার মধ্যে জনসাধারণকে অবহিত করা। ৪. সাংবাদিক ও হুমকির মুখে থাকা ব্যক্তিদের সুরক্ষা: পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা সাংবাদিকসহ অন্যান্য নাগরিকের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দেওয়া। ৫. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ: অপরাধীর দলীয় পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা আর্থিক প্রভাব যেন তদন্ত ও বিচারের পথে বাধা না হয়, তা নিশ্চিত করা। ৬. তথ্যভিত্তিক জবাবদিহি: নিয়মিত অপরাধ পরিসংখ্যান প্রকাশের পাশাপাশি কোন ধরনের অপরাধ কোথায় বাড়ছে বা কমছে, কতটি মামলা তদন্তাধীন এবং কতটি নিষ্পত্তি হয়েছে—সেসব তথ্যও সহজলভ্য করা। টার্গেট কিলিংয়ের মতো অপরাধ মোকাবিলায় শুধু কঠোর বক্তব্য কিংবা ঘটনার পর সাময়িক অভিযান যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন ধারাবাহিক তদন্ত, কার্যকর বিচার, অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, অপরাধের অভিযোগে কাউকে বিচারবহির্ভূতভাবে শাস্তি দেওয়া কোনো সমাধান নয়। অপরাধ দমনের নামে আইনের সীমা অতিক্রম করলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া এবং নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকারও সুরক্ষিত রাখা। একজন সাংবাদিকের মৃত্যু মানে সত্য অনুসন্ধানের পথ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা।
একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু মানে একটি পরিবারে শোকের পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতার নতুন ঝুঁকি। একজন ব্যবসায়ীর মৃত্যু মানে পরিবার ও জীবিকার অনিশ্চয়তা। আর একজন সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু মনে করিয়ে দেয়—নিরাপত্তাহীনতা শেষ পর্যন্ত কাউকে আলাদা করে দেখে না। রাষ্ট্রের শক্তি কেবল অপরাধী গ্রেপ্তারের সংখ্যায় নয়; বরং অপরাধ সংঘটনের আগেই ঝুঁকি কমানো, অপরাধের পর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। তাই প্রশ্নটি শুধু কতজন মানুষ হত্যার শিকার হলেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কতটি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হলো, কতজন অপরাধী প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারের মুখোমুখি হলেন এবং ভবিষ্যৎ হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো? নাগরিকের নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
দলীয় পরিচয়, পেশা, সম্পদ কিংবা প্রভাব নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের জীবন সুরক্ষিত রাখাই হতে হবে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষ আতঙ্ক নিয়ে ঘর থেকে বের হবে না; সাংবাদিক সত্য প্রকাশে ভয় পাবেন না; ব্যবসায়ী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন না; আর কোনো হত্যাকাণ্ড ক্ষমতার প্রভাব কিংবা তদন্তের দুর্বলতার কারণে অমীমাংসিত থেকে যাবে না। কারণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে আতঙ্ক বাড়ে; আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলে মানুষের রাষ্ট্রের ওপর আস্থা ফিরে আসে।
