

এসএসসি-২০২৬-এর ফল প্রকাশের পর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসকে নিয়ে আমার আগের লেখায় একটি কথা বলেছিলাম—কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্যকে প্রশ্ন করা যেতেই পারে, কিন্তু সেই প্রশ্ন হতে হবে তথ্যনির্ভর। এবার ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একটি চিঠি সামনে এসেছে। ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখের ওই চিঠিতে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ GPA-5 অর্জনের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য ও কারণ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ বোর্ড বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করতে চেয়েছে। প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—কোনো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া নিজেই অপরাধের প্রমাণ নয়। এটি একটি প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। বোর্ড তথ্য চাইতেই পারে, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষও নথি ও যুক্তি দিয়ে তার জবাব দেবে। তদন্ত হোক, তথ্য যাচাই হোক—এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু এই চিঠিকে ঘিরে আলোচনা করতে গিয়ে আমার মনে হচ্ছে, প্রশ্নটি শুধু নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসকে নিয়ে সীমাবদ্ধ রাখলে আমরা হয়তো আরও বড় একটি বিষয়কে আড়াল করে ফেলব।
প্রশ্নটা কি শুধু—‘এত ভালো ফল হলো কীভাবে?’ নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস এক বছর হঠাৎ করে ভালো ফল করেনি। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করে আসছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫, ২০১৭ ও ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ পরীক্ষার্থী GPA-5 পেয়েছিল। ২০২২ সালে ২৬৬ জন পরীক্ষার্থীর সবাই GPA-5 অর্জন করে। ২০২৩ সালে ২৭৮ জনের মধ্যে ২৭০ জন এবং ২০২৪ সালে ২৯৫ জনের মধ্যে ২৯৪ জন GPA-5 পায়; উভয় বছরেই শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। ২০২৫ সালে আবারও ৩২০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৩২০ জনই GPA-5 পায়। এই ফলাফল নিয়ে দেশের একাধিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় এবং প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত ক্লাস, বিশেষ ক্লাস, গাইড টিচার, হোম ভিজিট, টিউটোরিয়াল ও মাসিক পরীক্ষার মতো একাডেমিক কার্যক্রমের কথা তুলে ধরা হয়।
অর্থাৎ ২০২৬ সালের ফলাফল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘ ধারাবাহিকতার অংশ। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে—এত বছর ধরে একটি প্রতিষ্ঠান যখন ধারাবাহিকভাবে এমন ফলাফল করে আসছে, তখন সেই ফলাফল ও এর পেছনের প্রক্রিয়া নিয়ে নিয়মিত একাডেমিক তদারকি কতটা হয়েছে? এই প্রশ্নটি এনকেএমকে রক্ষা করার জন্য নয়। এটি শিক্ষা প্রশাসনের জবাবদিহির প্রশ্ন। ২০২৬ সালের ফলাফল কী বলছে? প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের টেস্ট পরীক্ষায় ৪৮৩ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে ১০১ জন নির্ধারিত মান অর্জন করতে পারেনি। পরবর্তীতে ৩৮২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং ওই ৩৮২ জনের সবাই GPA-5 অর্জন করে।
এখানেই বিতর্কের সূত্রপাত। কারও প্রশ্ন থাকতে পারে—টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে এত বড় পার্থক্য কীভাবে হলো? আবার প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হতে পারে—টেস্ট পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির মান যাচাই করা হয়েছে এবং যারা চূড়ান্ত পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত ছিল, তাদেরই এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের উপযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই দুই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার দায়িত্ব তথ্য ও নথি যাচাইকারী কর্তৃপক্ষের। তাই আমি বলব—প্রশ্ন থাকুক, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর বের হোক নথি দেখে। বোর্ড যে তথ্য চেয়েছে, সেগুলো কি আগে থেকেই পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকার কথা নয়? ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চিঠিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের তথ্য, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী, এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী এবং তাদের একাডেমিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এসব তথ্য চাওয়া অস্বাভাবিক নয়। বরং প্রয়োজন হলে আরও তথ্য চাওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—একজন শিক্ষার্থী কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলো, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত হলো, নিয়মিত পড়াশোনা করল, পরীক্ষায় অংশ নিল এবং শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষার্থী হলো—এই পুরো প্রক্রিয়ার বড় একটি অংশ তো প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত একাডেমিক ও প্রশাসনিক রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত। স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরও তো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে। তাহলে একটি প্রতিষ্ঠান যখন কয়েক বছর ধরে এমন ফলাফল করে আসছে, তখন নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এসব প্রশ্ন আগে থেকেই পরিষ্কার করা সম্ভব ছিল কি না—এটি ভাবার বিষয়। ভালো ফলাফল করা প্রতিষ্ঠানকে সন্দেহ করার জন্য নয়, বরং শিক্ষা প্রশাসনের মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার জন্য এই প্রশ্ন করা প্রয়োজন।
এখানেই আসে নরসিংদীর ‘বালুর মাঠ’ প্রসঙ্গ এনকেএমকে ঘিরে তদন্তের প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু একই সঙ্গে নরসিংদীর শিক্ষা ব্যবস্থার আরও কিছু প্রশ্ন সামনে আনা দরকার। নরসিংদীর বালুর মাঠ ও আশপাশের এলাকায় একাধিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। একই বৃহত্তর এলাকায় রয়েছে নরসিংদী সরকারি কলেজ এবং নরসিংদী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠতেই পারে— এত অল্প পরিসরে এতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছে? বিশেষ করে কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ক্ষেত্রে যদি নির্দিষ্ট দূরত্ব, অবস্থান বা অন্যান্য অবকাঠামোগত শর্ত প্রযোজ্য থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সেই শর্ত কীভাবে পূরণ করেছে? দূরত্ব সনদ দেওয়া হয়ে থাকলে সেটি কোন কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে যাচাই করেছে? কোন মাপজোখের ভিত্তিতে সনদ দেওয়া হয়েছে?
এগুলো কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। এগুলো অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রশ্ন। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ক্ষেত্রে যদি দূরত্ব, অবকাঠামো, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকসংখ্যা, শিক্ষা-উপকরণ বা অন্যান্য শর্ত বিবেচ্য হয়, তাহলে অনুমোদনের সময় যেমন সেগুলো যাচাই করা দরকার, তেমনি পরবর্তীতেও সেগুলো বাস্তবে বহাল আছে কি না—তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। নরসিংদী সদর উপজেলা প্রশাসনের সরকারি পোর্টালেও বিভিন্ন
অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশের প্রশ্নও আসা উচিত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, যোগ্য শিক্ষক, শিক্ষার উপকরণ, নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো, খেলাধুলার সুযোগ এবং একটি কার্যকর একাডেমিক ব্যবস্থাপনা। অতএব কোনো এলাকায় যদি অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, তাহলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও পাঠদানের সক্ষমতাও নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানের ভবন আছে কি না, তা যেমন প্রশ্ন; তার ভেতরে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ আছে কি না, সেটিও প্রশ্ন। শিক্ষক আছেন কি না, সেটি যেমন প্রশ্ন; সেই শিক্ষকরা বাস্তবে নিয়মিত পাঠদান করছেন কি না, সেটিও প্রশ্ন। শিক্ষার্থী আছে কি না, সেটি যেমন প্রশ্ন; সেই শিক্ষার্থীদের প্রকৃত উপস্থিতি, নিবন্ধন ও একাডেমিক অগ্রগতি কী, সেটিও প্রশ্ন। অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন থেকে ফলাফল পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাটিকেই একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে। ‘শিক্ষার্থী কোথা থেকে এলো’—এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ দেশে ভর্তি, লটারির মাধ্যমে নির্বাচন, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন, শূন্য আসন এবং নবম শ্রেণির নিবন্ধন—এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা হয়েছে।
কোনো প্রতিষ্ঠান প্রকৃত শূন্য আসনের তথ্য সঠিকভাবে দিয়েছে কি না, পরবর্তীতে শিক্ষার্থী পরিবর্তন বা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়েছে কি না, কোনো প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থী আকর্ষণ বা স্থানান্তরের মাধ্যমে নিজেদের ফলাফলগত অবস্থান পরিবর্তন করছে কি না—এসব বিষয়ও যদি কোথাও প্রশ্নের জন্ম দেয়, তাহলে সেগুলো তথ্য দিয়ে যাচাই করা উচিত। যদি নিয়ম মেনে হয়ে থাকে—ভালো। যদি নিয়মের ব্যত্যয় হয়ে থাকে—ব্যবস্থা হোক। কিন্তু একই মাপকাঠি সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে। তাহলে এনকেএমের ক্ষেত্রে কী হওয়া উচিত? আমার অবস্থান একেবারে পরিষ্কার। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ব্যাখ্যা চেয়েছে—এনকেএম কর্তৃপক্ষ যথাযথ জবাব দেবে। প্রয়োজনীয় নথি দেবে। শিক্ষার্থী ভর্তি থেকে শুরু করে নিবন্ধন, উপস্থিতি, টেস্ট পরীক্ষা, ফরম পূরণ ও এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ—পুরো প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করবে। যদি প্রমাণ হয় যে সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রশ্নের অবসান হওয়া উচিত। আর যদি কোনো অসঙ্গতি পাওয়া যায়, তাহলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এটাই স্বাভাবিক জবাবদিহি। আমি মনে করি, এনকেএম কর্তৃপক্ষেরও এই তদন্তকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই—যদি তাদের কার্যক্রম নিয়মসম্মত হয়ে থাকে। বরং এটাই সুযোগ তাদের দীর্ঘদিনের একাডেমিক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থী প্রস্তুতির প্রক্রিয়াকে নথি দিয়ে তুলে ধরার। কিন্তু শিক্ষা বোর্ডের কাছেও প্রশ্ন থাকবে একজন শিক্ষক হিসেবে আমার বিনীত প্রশ্ন—একটি প্রতিষ্ঠান যদি ২০১৫, ২০১৭, ২০২২, ২০২৪, ২০২৫ এবং এবার ২০২৬ সালেও ধারাবাহিকভাবে অসাধারণ ফলাফল করে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত একাডেমিক অডিট বা পর্যবেক্ষণের আওতায় আনার কোনো ব্যবস্থা কি থাকা উচিত নয়? যদি থাকে, তাহলে সেটি কীভাবে কাজ করেছে? আর যদি না থাকে, তাহলে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত নয় কি? কারণ ফলাফল প্রকাশের পর শোকজ করার চেয়ে ফলাফল তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি আগে থেকেই স্বচ্ছ ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায় থাকাই অধিক কার্যকর। একজন শিক্ষার্থী কোথায় ভর্তি হলো, কোন শ্রেণিতে নিবন্ধিত হলো, কতদিন উপস্থিত ছিল, পরীক্ষায় কী ফল করল, কখন ফরম পূরণ করল—এসব তথ্য যদি একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় থাকে, তাহলে বছর শেষে ‘কীভাবে এত ভালো ফল হলো’—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এতটা বিতর্কের প্রয়োজন হবে না। তদন্ত যদি হয়, তবে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে কেন? এখানেই আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আমি চাই তদন্ত হোক। তবে তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হোক।
দেখা হোক— • কোন প্রতিষ্ঠান কীভাবে অনুমোদন পেয়েছে; • কোথায় কতগুলো প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত হয়েছে; • দূরত্ব সনদ বা অন্যান্য প্রযোজ্য সনদ কীভাবে দেওয়া হয়েছে; • সরেজমিন পরিদর্শন কীভাবে হয়েছে; • প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শিক্ষার্থীসংখ্যা কত; • ভর্তি ও নিবন্ধনের তথ্য কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ; • শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন; • শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের অনুপাত কেমন; • প্রতিষ্ঠানটির ঘোষিত অবকাঠামো বাস্তবে কতটা আছে; • শিক্ষার্থী স্থানান্তর বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়েছে কি না; • এবং স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি কতটা কার্যকর। একটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল তদন্তের পাশাপাশি যদি পুরো ব্যবস্থার এই জায়গাগুলোও দেখা হয়, তাহলে তদন্তের প্রকৃত মূল্য থাকবে।
আরেকটি সংবেদনশীল প্রশ্ন—অনুমোদন ও সেবা প্রদানের স্বচ্ছতা বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশাসনে বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠান অনুমোদন, একাডেমিক স্বীকৃতি, EIIN, বই সরবরাহ, বিভিন্ন সনদ ও প্রশাসনিক সেবা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। তাই কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী না করে আমি শুধু বলতে চাই—এসব ক্ষেত্রে পূর্ণ ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি বইয়ের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ হচ্ছে কি না, প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ও বরাদ্দের মধ্যে পার্থক্য থাকলে তার কারণ কী, অতিরিক্ত বা ঘাটতি হলে সেটির হিসাব কোথায়—এসব তথ্যও ডিজিটালভাবে প্রকাশযোগ্য হওয়া উচিত। তাহলে অভিযোগের জায়গা কমবে, সন্দেহের জায়গাও কমবে। শতভাগ GPA-5 কি তাহলে সন্দেহের কারণ? না। আমার কাছে শতভাগ GPA-5 প্রথমত একটি অর্জন।
যদি ৩৮২ জন শিক্ষার্থী নিয়ম মেনে প্রস্তুতি নিয়ে, নিয়ম মেনে পরীক্ষা দিয়ে ৩৮২ জনই GPA-5 পেয়ে থাকে, তাহলে সেটি অবশ্যই অভিনন্দনের বিষয়। বরং আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই সাফল্যের পেছনে কী করা হয়েছে, যা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও করতে পারে? ২০২৫ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এনকেএমের নিয়মিত ক্লাস, বিশেষ ক্লাস, গাইড টিচার, হোম ভিজিট, টিউটোরিয়াল, মাসিক পরীক্ষা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকের সমন্বয়ের কথা উঠে এসেছে। এগুলো সত্যিই নিয়মিত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়ে থাকলে, তাহলে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এখান থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। ভালো ফলাফল যেন একদিন অপরাধ হয়ে না দাঁড়ায় আমরা শিক্ষকদের বলি—শিক্ষার্থীদের ভালো ফল করাও। অভিভাবকরা চান—সন্তান GPA-5 পাক। শিক্ষার্থীরা পরিশ্রম করে। একটি প্রতিষ্ঠান শিক্ষক নিয়োগ করে, অতিরিক্ত ক্লাস নেয়, নিয়মিত পরীক্ষা নেয়, দুর্বল শিক্ষার্থীকে আলাদা করে সময় দেয়। তারপর যখন কোনো প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে শতভাগ GPA-5 অর্জন করে, তখন অবশ্যই যাচাই হতে পারে—কিন্তু যাচাইয়ের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সত্য উদঘাটন, ভালো ফলাফলকে সন্দেহ করা নয়। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি যেন এমন না হয় যে কোনো শিক্ষার্থীকে বোর্ড থেকে চিঠি দিয়ে বলতে হয়— “তুমি GPA-5 পেয়েছ কেন? এত ভালো ফলাফলের উপযুক্ত কারণ দর্শাও!” এটি অবশ্যই একটি রসিকতা।
কিন্তু এর ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আছে। ভালো ফলাফলকে উৎসাহিত করতে হবে, আর ফলাফলের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখতে হবে। দুটো একসঙ্গে সম্ভব। শেষ কথা নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি—এটি মনে রাখা জরুরি। একইভাবে বোর্ডের ব্যাখ্যা চাওয়াকেও অমূলক বলা যায় না। বোর্ড তার দায়িত্ব অনুযায়ী তথ্য চাইছে, প্রতিষ্ঠান তার দায়িত্ব অনুযায়ী জবাব দেবে। এরপর সত্য যা, সেটিই সামনে আসুক। যদি প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে থাকে—তাহলে তাদের সম্মানের সঙ্গে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। যদি কোথাও ব্যত্যয় থাকে—সেটিরও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা হোক।
কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আরও বড় কিছু প্রশ্ন সামনে আসুক—অনুমোদন কীভাবে হয়, দূরত্ব কীভাবে যাচাই হয়, প্রতিষ্ঠান কীভাবে তদারক হয়, শিক্ষার্থী কীভাবে নিবন্ধিত হয় এবং ফলাফল তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যকে ছোট করা শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি নয়। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের আড়ালে যদি অনিয়ম থাকে, সেটি আড়াল করাও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি নয়। তাই তদন্ত হোক—কিন্তু একই মাপকাঠিতে। প্রশ্ন হোক—কিন্তু তথ্যের ভিত্তিতে। জবাবদিহি হোক—কিন্তু সবার জন্য। আর ভালো ফলাফল হলে—ভালো কাজের স্বীকৃতিও থাকুক। নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস যদি সত্যিই নিয়ম মেনে ধারাবাহিক এই সাফল্য অর্জন করে থাকে, তাহলে তাদের ২০২৬ সালের শতভাগ GPA-5 শুধু একটি ফলাফল নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে অনুসরণযোগ্য একটি শিক্ষা-মডেল নিয়ে ভাবারও সুযোগ। কেঁচো খুঁড়ে সাপ বের করার চেয়ে পুরো মাটিটা পরীক্ষা করা বেশি জরুরি। কারণ সমস্যা যদি কোথাও থাকে, সেটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে নাও থাকতে পারে—সমস্যা থাকতে পারে ব্যবস্থার কোনো স্তরে। আর যদি কোনো সমস্যা না থাকে, তাহলে সেটিও স্পষ্ট হোক। প্রসঙ্গ এনকেএম—প্রশ্ন থাকুক, তদন্ত হোক; কিন্তু শেষ কথা বলুক তথ্য, নথি ও সত্য।
মোঃ মাহামুদুল হাসান, অধ্যক্ষ, ফরিদপুর হাউজিং এস্টেট স্কুল এন্ড কলেজ।
