

আবু তাহের, গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ হারানো গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের তরুণ শ্রমিক খোকন মিয়ার (২৫) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তবে শেষ বিদায়ের মুহূর্তে স্বামীকে একবারের জন্যও দেখতে না পাওয়ার বেদনায় ও শিশু সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় ভেঙে পড়েছেন তাঁর স্ত্রী শাপলা বেগম।
গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকায় অবস্থিত ‘ফেরদৌস স্টিল’ নামের একটি জাহাজভাঙা কারখানায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। স্ক্র্যাপ জাহাজের একটি গ্যাস সিলিন্ডার কাটাকাটির সময় অসাবধানতা বশত বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে এতে এ পর্যন্ত ৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের কিসমত হলদিয়া গ্রামের মোঃ রানা মিয়ার ছেলে খোকন মিয়া। শনিবার সকালে নিহত খোকনের মরদেহ নিজ গ্রাম কিসমত হলদিয়ায় পৌঁছালে পুরো এলাকায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। দুপুর ১২টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে জানাজা শেষে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়। তবে ঘটনার পর দিনই লাশ গ্রামের বাড়ি এনে তড়িঘড়ি দাফন করা নিয়ে ক্ষোভ ও কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত খোকনের স্ত্রী শাপলা বেগম। তিনি বলেন: "ঘটনার সময় আমি বাবার বাড়িতে ছিলাম। প্রথম দিকে খোকনের মৃত্যুর খবর আমাকে জানানোই হয়নি। পরবর্তীতে খবর পেয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। কিন্তু মাঝপথে শুনতে পাই কারখানা কর্তৃপক্ষ ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন লাশ বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। আমি বাড়ি পৌঁছানোর আগেই দাফন শেষ করা হয়। এমনকি আমার দেড় বছরের অবুঝ শিশু সন্তানকেও তার বাবার শেষ চেহারাটি দেখতে দেওয়া হয়নি।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর পরই তাঁর শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে তাঁকে ও তাঁর সন্তানকে অস্বীকার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
খোকন মিয়া ছিলেন তাঁর পুরো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বৃদ্ধ পিতা-মাতা, স্ত্রী ও দেড় বছরের একটি শিশু সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। খোকনের অকাল মৃত্যুতে পরিবারটি এখন চরম দিশেহারা।
কোলে থাকা অবুঝ সন্তানকে জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্ত্রী শাপলা বলেন, "এই ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে আমি এখন কোথায় যাব? আমার আর কোনো চলার পথ রইল না। সরকার ও কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে আমার আকুল আবেদন, তারা যেন আমার ও আমার অবুঝ সন্তানের দিকে সুনজর দেন। আমার বাচ্চা যাতে ভবিষ্যতে অন্তত বেঁচে থাকার অধিকার পায়, সেই ব্যবস্থা করা হোক।"
এ মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে কারখানা কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না! তার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। সেই সঙ্গে নিহত শ্রমিক খোকনের অসহায় স্ত্রী-সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে দ্রুত কারখানা কর্তৃপক্ষ ও সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ এবং স্থায়ী আর্থিক সহায়তার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।
