

ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট:
বাগেরহাটের হজরত খানজাহান আলী (রহ.) এর মাজার সংলগ্ন দিঘিতে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী কুমির প্রজনন ও বসবাসের ইতি টেনে শেষ কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী কেন্দ্রে স্থানান্তর করেছে বন বিভাগ।
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘিতে দীর্ঘ সময় ধরে দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকা সর্বশেষ কুমিরটিকে গত ৩ জুন বুধবার দুপুরে সফলভাবে উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় বন বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল এবং উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে মাজার সংলগ্ন ছোট একটি পুকুর থেকে কুমিরটিকে আটক করা হয়। সকাল ১০টার দিকে দিঘির পূর্ব পাড়ে প্রাণীটির উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই উদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হয়। দীর্ঘ চেষ্টার পর খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে কুমিরটিকে নিয়ন্ত্রণে এনে হাত-পা ও চোখ বেঁধে ফেলা হয় এবং বেলা ১২টার দিকে বন বিভাগের বিশেষ গাড়িতে করে সেটিকে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ঐতিহাসিক এই দিঘিতে কুমিরের বংশপরম্পরা রক্ষা এবং দর্শনার্থীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু থাকা প্রাণীটিকে সরানোর মাধ্যমে মাজার এলাকায় একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
দীর্ঘদিন ধরে এই দিঘির কুমিরগুলো নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও প্রাণীটির প্রাকৃতিক পরিবেশের অভাব নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, দিঘির অস্বাভাবিক পরিবেশ এবং দর্শনার্থীদের অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কুমিরগুলো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছিল না। উদ্ধার অভিযানের সময় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কুমিরটি দিঘির পাড়ে ওঠার পর থেকে উদ্ধারের আগ পর্যন্ত এলাকাটিতে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছিল। মাজার এলাকায় আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রাণীটির শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। বন বিভাগের কর্মীরা যখন কুমিরটিকে রশির সাহায্যে বাঁধার চেষ্টা করছিলেন, তখন উৎসুক জনতার ভিড় পরিস্থিতিকে কিছুটা জটিল করে তুলেছিল, যা বন্যপ্রাণী স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছিল।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. আতিয়া খাতুন জানিয়েছেন, জননিরাপত্তার স্বার্থেই মাজার কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ সিদ্ধান্তে কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এটি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘদিনের পর্যালোচনা ও প্রাণী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ফসল। বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কুমিরটি আপাতত খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকবে এবং সেখানে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে। তবে মাজারের ঐতিহাসিক দিঘিতে পরবর্তীতে আর কোনো কুমির অবমুক্ত করা হবে কি না বা এই দিঘির পরিবেশগত ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো চূড়ান্ত কোনো দিকনির্দেশনা প্রদান করেনি, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
ঐতিহ্য ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ এই মাজার প্রাঙ্গণ থেকে কুমির অপসারণের ঘটনাটি পরিবহন ও পর্যটন খাতে এক নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে। কুমির দেখার উদ্দেশ্যে দেশের নানা প্রান্ত থেকে যে পর্যটকরা এখানে আসতেন, তাদের জন্য এই পরিবর্তনটি যাতায়াত ও দর্শনীয় স্থান নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ করবে। প্রশাসনের এই পদক্ষেপের ফলে মাজার এলাকায় জননিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও, দীর্ঘদিনের লালিত ঐতিহ্য হারানোর বেদনা স্থানীয়দের মধ্যে কাজ করছে। এখন দেখার বিষয় হলো, কুমিরশূন্য এই দিঘিকে ঘিরে প্রশাসন ভবিষ্যতে কোনো নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে কি না এবং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে মাজারের আকর্ষণ বজায় রাখতে কর্তৃপক্ষ কী ধরনের বিকল্প পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
