ঢাকা
প্রকাশিত : October 22, 2026
আপডেট: October 22, 2026
প্রকাশিত : October 22, 2026

সাংবাদিকতা কি শুধু সাংবাদিকদের জন্য ?

এস এম আওলাদ হোসেন সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।

সাংবাদিকতা কি কেবল একটি নির্দিষ্ট পেশার মানুষের জন্য সংরক্ষিত, নাকি অন্য পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরাও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন? শিক্ষক, ব্যবসায়ী কিংবা অন্য কোনো পেশায় কর্মরত ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করতে পারবেন কি না—এ প্রশ্ন নতুন নয়।

তবে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিমের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিষয়টিকে নতুন করে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে। গত ২১ অক্টোবর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেছেন, শিক্ষক কিংবা অন্য পেশায় কর্মরত ব্যক্তিদের সাংবাদিকতা করার সুযোগ নেই। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর হলো, সাংবাদিকতা একটি স্বতন্ত্র ও দায়িত্বশীল পেশা; এখানে পেশাগত শৃঙ্খলা, নিরপেক্ষতা, তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলা অপরিহার্য। এসব নীতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণের সুযোগ কম।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বক্তব্য কি দেশের প্রচলিত আইন ও সব ধরনের চাকরিবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি এর ব্যাখ্যায় আরও আইনি স্পষ্টতা প্রয়োজন ? সাংবাদিকতা মানে শুধু কোনো সংবাদপত্রের পরিচয়পত্র বহন করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের নামের পাশে ‘সাংবাদিক’ লেখা নয়। সাংবাদিকতা হলো তথ্য অনুসন্ধান, নথিপত্র যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, জনস্বার্থে অনিয়ম উন্মোচন এবং ক্ষমতাসীন কিংবা প্রভাবশালী মহলের জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব।

একইভাবে, একজন ব্যবসায়ী সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাঁর ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত দেখা দিতে পারে। তিনি যদি নিজের প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম আড়াল করেন কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যাচাইহীন সংবাদ প্রকাশ করেন, তাহলে তা পেশাগত নৈতিকতার গুরুতর লঙ্ঘন হতে পারে। কিন্তু কেবল ব্যবসায়ী পরিচয় থাকার কারণে তাঁর প্রতিটি সংবাদকর্মকে অনৈতিক বলা যাবে না। এখানে মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত—ব্যক্তি কী কাজ করছেন, তাঁর কাজের সঙ্গে মূল পেশার সংঘাত রয়েছে কি না, তিনি কোনো নিয়ম ভঙ্গ করছেন কি না এবং সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন কি না।

অর্থাৎ, সমস্যাটি শুধু দ্বৈত পেশা নয়; সমস্যাটি হলো দায়িত্বের সংঘাত, স্বার্থের গোপন সম্পর্ক, পেশাগত অসততা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তির পরিচয়ের পরিবর্তে তাঁর কর্মকাণ্ড ও প্রযোজ্য বিধি যাচাই করা অধিক ন্যায়সংগত। বর্তমানে সাংবাদিকতার পরিচয়পত্রকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ সংবাদ প্রকাশের দায়িত্ব পালন না করেও পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন; কেউ পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসন বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন; আবার কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য সংবাদ প্রকাশ বা প্রকাশ না করার হুমকি দেন—এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সব সাংবাদিক, সব খণ্ডকালীন সংবাদদাতা কিংবা অন্য পেশায় কর্মরত সব লেখককে একইভাবে বিচার করা যাবে না। অভিযোগ প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন অনুচিত, তেমনি প্রকৃত অনিয়মকে পেশাগত স্বাধীনতার আড়ালে রক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। পরিচয়পত্র দেওয়ার আগে নিয়োগের শর্ত, সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব, কাজের মূল্যায়ন এবং পেশাগত আচরণবিধি স্পষ্ট করা দরকার। পরিচয়পত্রের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রেস কাউন্সিল, গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকলে পেশাদার সাংবাদিকতার মান উন্নয়ন সহজ হবে। তবে সেই উদ্যোগ যেন প্রকৃত সাংবাদিকদের স্বাধীনতা খর্ব করার হাতিয়ার না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার মান উন্নয়ন এবং ভুয়া সাংবাদিকতার অপব্যবহার বন্ধ করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

প্রথমত, সাংবাদিকতার পরিচয় ও পেশাগত স্বীকৃতির মানদণ্ড স্পষ্ট করতে হবে। কে পূর্ণকালীন সাংবাদিক, কে খণ্ডকালীন সংবাদদাতা এবং কে কেবল লেখালেখি বা মতামত প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত—এসবের মধ্যে প্রয়োজনীয় পার্থক্য থাকা উচিত। দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কোন ধরনের সাংবাদিকতামূলক কর্মকাণ্ড অনুমোদিত এবং কোনটি চাকরিবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তা সংশ্লিষ্ট বিধি ও নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী পরিষ্কার করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় কিংবা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টির অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয় অপব্যবহারের অভিযোগ যেন প্রকৃত সাংবাদিকদের হয়রানি করার অজুহাত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ, তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা, আইন সম্পর্কে ধারণা এবং পেশাগত নৈতিকতা উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু পরিচয়পত্র নিয়ন্ত্রণ করে সাংবাদিকতার মান বাড়ানো সম্ভব নয়; প্রয়োজন দক্ষতা, জবাবদিহি ও স্বাধীন সম্পাদকীয় পরিবেশ। পঞ্চমত, প্রেস কাউন্সিলের বক্তব্য ও নীতিগত নির্দেশনার ক্ষেত্রে আইনি ভিত্তি স্পষ্ট করা জরুরি। কোনো নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধের কথা বলা হলে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি, ধারা এবং তার প্রয়োগের পরিধি উল্লেখ করা উচিত। এতে ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ কমবে এবং সাংবাদিক, শিক্ষক, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি তৈরি হবে না। সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের লাইসেন্স নয়; এটি জনস্বার্থে সত্য প্রকাশের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে পেশাগত সততা, নিরপেক্ষতা, তথ্য যাচাই এবং স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলার বিকল্প নেই।

প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের বক্তব্যে পেশাগত শৃঙ্খলা ও সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষার যে গুরুত্ব উঠে এসেছে, তা অবশ্যই আলোচনার দাবি রাখে। তবে সাংবাদিকতার মান রক্ষার প্রশ্নে আইন ও নীতিমালার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা অপরিহার্য। অন্য পেশায় কর্মরত ব্যক্তিরা সাংবাদিকতা করতে পারবেন কি না, তার উত্তর শুধু একটি সাধারণ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত নয়; বরং সংশ্লিষ্ট আইন, চাকরিবিধি, নিয়োগের শর্ত, কাজের ধরন এবং স্বার্থের সংঘাতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। সাংবাদিকতার পরিচয়পত্রের অপব্যবহার বন্ধ হোক, পেশাদার সাংবাদিকতার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকুক। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি যেন পেশাগত পরিচয়ের আড়ালে অনৈতিক সুবিধা নিতে না পারেন, আবার আইনি ভিত্তি ছাড়া কারও আইনসম্মত মতপ্রকাশের পথও যেন রুদ্ধ না হয়। সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষার সর্বোত্তম পথ নির্বিচার নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং আইনের শাসন, স্পষ্ট নীতিমালা, পেশাগত জবাবদিহি এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার সমন্বিত প্রতিষ্ঠা।

প্রকাশক ও সম্পাদক - সিকদার সাদেকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক- জাহিদুল হাসান জাহিদ
কার্যালয়ঃ ৪ দারুসসালাম রোড, মিরপুর, ঢাকা।
aazkaalbangla@gmail.com
মোবাইলঃ +8801842280000
আজকাল বাংলা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2021-2025 AjkalBangla.Com All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram