

এস এম আওলাদ হোসেন, সিনিয়র রিপোর্টার।।
ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় নির্মাণ করা হয়েছে ৪৬৭টি ঘর। তবে প্রকল্পের এসব ঘর নিয়ে উঠেছে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের পরিবর্তে স্বচ্ছল পরিবার এবং জনপ্রতিনিধিদের স্বজনদের কেউ কেউ ঘর পেয়েছেন। আবার দীর্ঘদিন ধরে বসবাস না করায় ১২৪টি ঘরে ঝুলছে তালা। কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে সন্ধ্যার পর মাদকের আড্ডা বসারও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে খোঁজ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রায়পুর উপজেলার নয়টি আশ্রয়কেন্দ্রে মোট ৪৬৭টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪৩টি ঘরে মানুষ বসবাস করলেও ১২৪টি ঘর দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নানা সমস্যা ও অনুকূল পরিবেশের অভাবে অনেক উপকারভোগী আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে বসবাস করছেন না।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোতে বিশুদ্ধ পানির সংকট, ডিপটিউবওয়েলের অভাব বা নষ্ট হয়ে যাওয়া, জলাবদ্ধতা, পুকুরের ঘাট ভাঙা, কবরস্থান ও শ্মশানের ব্যবস্থা না থাকা এবং কোথাও কোথাও ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো সমস্যার অভিযোগ রয়েছে।
রায়পুর উপজেলার বামনী ইউনিয়নের বাংলাবাজারে ৯৪টি, শিবপুরে ১০টি, কেরোয়া ইউনিয়নের মীরগঞ্জ বাজার এলাকায় ৯টি, দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের মিয়াহাটে ৪৫টি, হাজিমারা এলাকায় ৪৪টি, কারিমিয়া এলাকায় ১১৭টি, উত্তর চরবংশীর কুচিয়ামারায় ২৪টি, মদিনাবাজারে ৪৩টি এবং দক্ষিণ চর আবাবিল ইউনিয়নের উদমারা গ্রামে ৭৯টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে বামনী ইউনিয়নের বাংলাবাজারে ৪০টি, দক্ষিণ চরবংশীর মিয়াহাটে ১৪টি, হাজিমারা এলাকায় ১৪টি, উত্তর চরবংশীর মদিনাবাজারে ১৩টি, কুচিয়ামারায় ৮টি, চর আবাবিলের উদমারায় ১১টি এবং কারিমিয়া এলাকায় ২৪টি ঘর তালাবদ্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পাওয়ার ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বাদ দিয়ে স্বচ্ছল পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে এমন অভিযোগ বেশি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, যাদের বসতভিটা, ঘর ও আবাদি জমি রয়েছে, তাদের কয়েকজনের নামও আশ্রয়ণ প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো পরিবারের সদস্যের দাবি, তাদের নামে ঘর বরাদ্দ হলেও তারা বিষয়টি জানতেন না।
এ ছাড়া ঘর বরাদ্দের ক্ষেত্রে ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে। যদিও সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মাটি ভরাট ও ঘরের মেঝে-বারান্দার কাজের জন্য এসব অর্থ নেওয়া হয়েছিল।
দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের হাজিমারা ও মিয়াহাট এলাকায় ঘর পাওয়া কয়েকজনের কাছ থেকে ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। উপজেলা ভূমি অফিস দলিল রেজিস্ট্রির খরচ বাবদ ১ হাজার ২০০ টাকা করে নিয়েছে বলেও জানা গেছে।
এ ছাড়া ঘরপ্রাপ্ত পরিবারের সদস্যদের দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে মাটি কাটা, ভরাটসহ বিভিন্ন শ্রমের কাজ করানোর অভিযোগও রয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর কয়েকটি এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাদকের আড্ডা বসে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে কিছু ঘর তালাবদ্ধ থাকায় এবং পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় কিছু স্থান অপরাধীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে কেউ কেউ হয়রানি বা লাঞ্ছনার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু সালেহ মিন্টু ফরাজি বলেন, অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণে নিম্নমানের কাজ হয়েছিল। মেঝে ও বারান্দায় মাটি ভরাটের জন্য উপকারভোগীদের কাছ থেকে ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। রেজিস্ট্রির জন্য ভূমি অফিস ১ হাজার ২০০ টাকা নিয়েছিল বলেও তিনি জানান।
সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মারুফ বিন জাকারিয়া এবং স্থানীয় সমাজসেবক মনির হোসেন মোল্লা অভিযোগ করেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম হয়েছে। তাদের দাবি, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে ঘর বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে মাদকের আড্ডার অভিযোগও তারা শুনেছেন বলে জানান।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদি হাসান কাউছার বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১২৪টি ঘর তালাবদ্ধ রয়েছে। তালিকায় কোনো স্বচ্ছল ব্যক্তি থাকলে যাচাই করে তাদের বাদ দিয়ে প্রকৃত গৃহহীনদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হবে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
রায়পুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা জানান, ১২৪টি ঘরে কেউ বসবাস না করায় নতুন করে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবদুল হাই খান বলেন, এসব ঘর তার পূর্ববর্তী কর্মকর্তা প্রকৌশলী আশিকুর রহমানের সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিল।
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই সামাজিক নিরাপত্তামূলক প্রকল্পের সুফল প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের কাছে পৌঁছাতে বরাদ্দের তালিকা পুনঃযাচাই, বন্ধ থাকা ঘরগুলো পরিদর্শন, অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধান এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
