ঢাকা
১৩ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ১১:৩৮
প্রকাশিত : আগস্ট ১৩, ২০২৬
আপডেট: আগস্ট ১৩, ২০২৬
প্রকাশিত : আগস্ট ১৩, ২০২৬

ফলাফলের আড়ালে যে গল্প: নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস কেন অনুসরণীয় হতে পারে

বিশেষ প্রতিবেদক:

একটি ভালো ফলাফল সংবাদ তৈরি করে, কিন্তু ধারাবাহিক ভালো ফলাফল একটি শিক্ষা-পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এই সাফল্য? এসএসসি-২০২৬-এর ফল প্রকাশের পর আবারও আলোচনায় এসেছে নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির ফলাফল নিয়ে যেমন প্রশংসা এসেছে, তেমনি উঠেছে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনাও। একজন শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে বিষয়টি আমার কাছে একটু ভিন্নভাবে দেখার মতো মনে হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ফলাফল ভালো হয়েছে কি না—শুধু সেটি জানাই যথেষ্ট নয়। বরং জানতে হয়, সেই ফলাফলের পেছনে কী ধরনের একাডেমিক ব্যবস্থা কাজ করেছে, শিক্ষার্থীদের কীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের শিক্ষা-সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসকে দেখা যেতে পারে।

একটি ফলাফল, নাকি ধারাবাহিকতার গল্প? প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠানটির এসএসসি ফলাফল উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালে ২৯৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৯৪ জন GPA-5 অর্জন করে এবং শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। ২০২৫ সালে ৩২০ জন পরীক্ষার্থীর সবাই GPA-5 অর্জন করে। এই ফলাফল দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।

অর্থাৎ ২০২৬ সালের ফলাফলকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ ফলাফল করার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা-পদ্ধতি নিয়ে ভাবার একটি কারণ তৈরি করে। এসএসসি-২০২৬ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, টেস্ট পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪৮৩ জন। তাদের মধ্যে ১০১ জন নির্ধারিত মান অর্জন করতে পারেনি। পরবর্তীতে ৩৮২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং ওই ৩৮২ জনের সবাই GPA-5 অর্জন করে। এই তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। মতভেদও থাকতে পারে। তবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ফলাফলের শেষ সংখ্যাটি দেখলে হবে না; দেখতে হবে পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছে। সাফল্যের পেছনে কী আছে? প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক প্রদত্ত তথ্য ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো—এখানে পরীক্ষার কয়েক মাস আগে প্রস্তুতি নেওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের একাডেমিকভাবে প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি অধ্যায়ভিত্তিক মডেল টেস্ট, সাপ্তাহিক রিকভারি ক্লাস, প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন আদায়ের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আফটার-স্কুল একাডেমিক সাপোর্ট দেওয়ার কথা জানা যায়। আরও একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো—প্রতি ১২ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন গাইড টিচার নির্ধারণ। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর একাডেমিক অগ্রগতি, দুর্বলতা, উপস্থিতি ও ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়। শুধু শ্রেণিকক্ষে বসে একজন শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন না করে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেওয়া, নিয়মিত অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পার্বিক পরীক্ষার পর শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবককে নিয়ে ফলাফল বিশ্লেষণের মতো উদ্যোগও প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক ব্যবস্থাপনার অংশ বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সময় ধরে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হোস্টেল সুবিধার কথাও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। এসব উদ্যোগের প্রতিটির কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—শিক্ষার্থীর ফলাফলকে শুধু পরীক্ষার ফল হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখার চেষ্টা এখানে রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: দুর্বল শিক্ষার্থীকে কতটা সময় দেওয়া হচ্ছে? বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভালো শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফল করানো তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু একজন দুর্বল বা পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করে তাকে ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে আসাই আসল চ্যালেঞ্জ।

এনকেএমের যে মডেলটি সবচেয়ে বেশি মনোযোগ পাওয়ার দাবি রাখে, তা হলো—early identification এবং continuous follow-up। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী কখন পিছিয়ে পড়ছে, কেন পিছিয়ে পড়ছে এবং তাকে কীভাবে আবার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা যায়—সেটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। প্রতি ১২ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন গাইড শিক্ষক, হোম ভিজিট, অভিভাবক যোগাযোগ এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন—এই ব্যবস্থাগুলো অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অনুসরণ করতে পারে।

GPA-5-এর বাইরেও কি সাফল্য আছে? একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারণে শুধু GPA-5 দিয়ে সবকিছু বিচার করা ঠিক নয়। এই জায়গাতেও নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের কিছু অর্জন উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী Waasbir Rwadi Shahriar Junior Category-তে Champion হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এ ধরনের অর্জন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একজন শিক্ষার্থীর মেধা কেবল বোর্ড পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ নয়। গণিত, বিজ্ঞান, বিতর্ক, সাহিত্য, খেলাধুলা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন। তাই এনকেএমের সাফল্যকে শুধু ‘GPA-5-এর স্কুল’ হিসেবে দেখলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমের একটি বড় অংশ অদেখা থেকে যাবে।

সমালোচনা অবশ্যই হবে—তবে তথ্যের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। বরং একটি ভালো প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়েও প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। টেস্ট পরীক্ষায় যারা কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারেনি, তাদের বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তবে এমন বিষয়ে মন্তব্য করার আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বিধি, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব একাডেমিক নীতি এবং বাস্তব প্রক্রিয়াটি জানা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি অসম্পূর্ণ তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের একটি ফলাফল তৈরি হয় বহু মাসের ক্লাস, পরীক্ষা, মূল্যায়ন, অভিভাবক যোগাযোগ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানকে সমালোচনা করতে হলে তথ্য দিয়ে সমালোচনা করা উচিত। আবার কোনো প্রতিষ্ঠান ভালো করলে তার ভালো কাজের স্বীকৃতিও দেওয়া উচিত। অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কী শেখার আছে? আমার কাছে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি তাদের GPA-5-এর সংখ্যা নয়; বরং ফলাফল তৈরির প্রক্রিয়া।

একটি প্রতিষ্ঠান যদি নিয়মিত মূল্যায়ন করতে পারে, দুর্বল শিক্ষার্থীকে দ্রুত শনাক্ত করতে পারে, শিক্ষকের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ বাড়াতে পারে, অভিভাবককে একাডেমিক প্রক্রিয়ার অংশ করতে পারে এবং শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সহায়তা দিতে পারে—তাহলে তার ফলাফলে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সীমিত জনবল, অর্থ ও অবকাঠামোর মধ্যেও কাজ করছে। তাদের পক্ষে এনকেএমের সব ব্যবস্থা হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু ধারণাগুলো গ্রহণ করা সম্ভব। প্রতি ১২ জনে একজন গাইড শিক্ষক সম্ভব না হলে প্রতি ২০ বা ৩০ জনে একজন হতে পারেন। রাত ১০টা পর্যন্ত ক্লাস সম্ভব না হলে স্কুল-পরবর্তী এক ঘণ্টার সাপোর্ট দেওয়া যেতে পারে। হোম ভিজিট সম্ভব না হলে ফোনে নিয়মিত অভিভাবক ফলোআপ করা যেতে পারে। অর্থাৎ মডেলটি কপি করার চেয়ে মডেলটির দর্শনটি বোঝাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বশেষ
প্রকাশক ও সম্পাদক - সিকদার সাদেকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক- জাহিদুল হাসান জাহিদ
কার্যালয়ঃ ৪ দারুসসালাম রোড, মিরপুর, ঢাকা।
aazkaalbangla@gmail.com
মোবাইলঃ +8801842280000
আজকাল বাংলা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2021-2025 AjkalBangla.Com All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram