

মো. নজরুল ইসলাম,মানিকগঞ্জ:
মানিকগঞ্জে অনুষ্ঠিত এক নাগরিক সংলাপে বক্তারা বলেছেন, দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষিজমি সংকুচিত হওয়া, একফসলি চাষের বিস্তার, নদী-জলাশয় ধ্বংস, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অ্যাগ্রোইকোলজি ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কৃষক এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
“অ্যাগ্রোইকোলজির পথ ধরি, খাদ্যসার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করি”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) মানিকগঞ্জের আরব ভবনের সেমিনার কক্ষে ‘খাদ্যব্যবস্থা, আঞ্চলিক বাস্তবতা ও অ্যাগ্রোইকোলজির পথ: ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই ভবিষ্যতের সন্ধান’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক এবং রোজা লুক্সেমবার্গ স্টিফটাং (দক্ষিণ এশিয়া) যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে মানিকগঞ্জ জেলা গ্রিন কোয়ালিশনের যুগ্ম আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আলম সভাপতিত্ব করেন। সঞ্চালনা করেন বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল চন্দ্র রায়। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মানিকগঞ্জের প্রশিক্ষণ বিভাগের অতিরিক্ত উপপরিচালক মুহাম্মদ মতিয়ার রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বারসিকের পরিচালক সিলভানুস লামিন।
সংলাপে অংশ নেন অধ্যাপকমাইনুদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুর রহমান, অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান মিলন, শিক্ষক নেতা মীর্জা ইস্কান্দার, সাংবাদিক নেতা শিকদার শামিম আল মামুন, মানিকগঞ্জ কাঁচাবাজার আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি মো. শাখাওয়াত হোসেন, কৃষক সমিতির জেলা সহ-সভাপতি *কমরেড দুলাল বিশ্বাস, নবগ্রাম ইউনিয়ন গ্রিন কোয়ালিশনের আহ্বায়ক মাহমুদ হায়দার খোকন, নদী ও প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষার আঞ্চলিক প্রতিনিধি মো. হোসেন আলী মাস্টার, কবি ও সাহিত্যিক কল্পনা সুলতানা এবং গ্রিন মাইন্ড ইয়ুথ ফোরামের পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক সম্পাদক গাজী নাবিউর আহমেদ শাওন।
বক্তারা বলেন, মানিকগঞ্জে কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে শস্যবৈচিত্র্য হ্রাস পেয়ে এককভাবে ভুট্টা ও তামাক চাষের প্রবণতা বাড়ছে, যা খাদ্যব্যবস্থা ও পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। কৃষিকে টেকসই রাখতে দেশীয় বীজ সংরক্ষণ, বহুমুখী ফসল চাষ এবং অ্যাগ্রোইকোলজিভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
তারা আরও বলেন, পদ্মা, যমুনা ও কালীগঙ্গা নদীর ভাঙনে প্রতিবছর কৃষিজমি ও বসতি বিলীন হচ্ছে। অন্যদিকে ধলেশ্বরী, ইছামতী, গাজীখালী, ক্ষীরাই, কান্তাবতী ও ভূবনেশ্বর নদী দখল, দূষণ ও নাব্যতা সংকটে অস্তিত্ব হারানোর পথে। একই সঙ্গে খাল-বিল, পুকুর, ডোবা ও বাওড়ে পানির সংকট সৃষ্টি হওয়ায় জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অধিক মুনাফার আশায় রাসায়নিক সার ও ক্ষতিকর কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মাটির উর্বরতা, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঋতুচক্রের পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষি উৎপাদনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
সংলাপ থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বারসিকের মতো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রম সম্প্রসারণের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে খাদ্যসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সংলাপে বক্তারা বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা (Food Security) এবং নিরাপদ খাদ্য (Food Safety) একে অপরের পরিপূরক হলেও তাদের ধারণাগত পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় চ্যালেঞ্জ। সেই লক্ষ্য অর্জনে অ্যাগ্রোইকোলজিভিত্তিক কৃষি চর্চা, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং কৃষকবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
