

মো.জাহিদুল হাসান জাহিদ:
গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। তবে এই স্তম্ভকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের যে মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তা প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়। অন্যের অধিকার ও মানবিকতার কথা বলতে গিয়ে সাংবাদিকরা নিজেরা কীভাবে এক চরম অমানবিক ও অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হচ্ছেন, তা নিয়েই এই বিশেষ প্রতিবেদন।
১. জীবনের ঝুঁকি ও আইনি হয়রানি
দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করায় সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত প্রভাবশালী মহলের আক্রোশের শিকার হন।
সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে রাজনৈতিক কর্মী বা অপরাধী চক্রের হাতে লাঞ্ছিত হওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা।
মুক্ত সাংবাদিকতার পথে বড় বাধা বিভিন্ন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং প্রভাবশালীদের করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মানহানির মামলা।
যুদ্ধক্ষেত্র, দাঙ্গা বা দুর্যোগের মাঝে কোনো রকম নিরাপত্তা সরঞ্জাম (যেমন— বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট) ছাড়াই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়।
২. অর্থনৈতিক অমানবিকতা ও শোষণ
মফস্বল বা জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অধিকাংশ সাংবাদিক কোনো নির্দিষ্ট মাসিক বেতন পান না।
অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকদের বেতন না দিয়ে উল্টো তাদের ওপর বিজ্ঞাপন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেয়।
সরকারি নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো (ওয়েজ বোর্ড) অধিকাংশ মিডিয়া হাউজেই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয় না।
যেকোনো সময় ছাঁটাই বা পূর্ব নোটিশ ছাড়াই মিডিয়া হাউজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সাংবাদিকরা চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়েন।
৩. মানসিক ট্রমা ও সামাজিক একাকীত্ব
খুন, ধর্ষণ বা দুর্ঘটনার ছবি ও তথ্য প্রতিনিয়ত সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা তীব্র মানসিক ট্রমার শিকার হন।
২৪ ঘণ্টা খবরের পেছনে ছুটে চলার কারণে পরিবার ও সামাজিক জীবন থেকে তারা প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
একদিকে পেশাগত সততা, অন্যদিকে টিকে থাকার লড়াই—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে তৈরি হয় তীব্র মানসিক চাপ।
৪. হলুদ সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতার উত্থান
চরম অর্থনৈতিক অনটনের সুযোগ নিয়ে অনেক সময় সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহার করা হয়।
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা নৈতিকতা ছাড়াই কার্ডধারী একশ্রেণীর "ভুয়া সাংবাদিকের" দাপট আসল সাংবাদিকদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। সাংবাদিকতা একটি মহৎ মিশন হলেও এর পেছনের কারিগরদের জীবন আজ এক অমানবিক বৃত্তে বন্দী। সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ এবং সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়ন না করলে সমাজের এই "আলোর প্রদীপটি" একসময়" নিভে যাবে।
