

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার:
পর্যটন নগরী কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কে কাগজপত্র ও বৈধ নিবন্ধনবিহীন মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। 'রেন্ট-এ-বাইক' ব্যবসার আড়ালে শত শত অবৈধ মোটরসাইকেল পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে এসব মোটরসাইকেল নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ করে দিতে ট্রাফিক পুলিশ, হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ি ও ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির কিছু অসাধু সদস্য মাসিক প্রায় তিন লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা আদায় করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কলাতলী মোড়, সুগন্ধা পয়েন্ট, বেলী হ্যাচারি, জমজম হ্যাচারি এলাকা এবং মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন স্থানে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য রেন্ট-এ-বাইক স্ট্যান্ড। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে অন্তত শতাধিক ব্যক্তি এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের কাছে রয়েছে তিন শতাধিক মোটরসাইকেল, যার বড় অংশেরই বৈধ কাগজপত্র, ফিটনেস কিংবা নিবন্ধন নেই। অনেক মোটরসাইকেল সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে আনা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি রাজস্ব পরিশোধ না করেই এসব মোটরসাইকেল পরিচালিত হচ্ছে। অথচ সংশ্লিষ্ট সংস্থার কার্যকর নজরদারি না থাকায় ব্যবসাটি দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে।
কলাতলীর ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সামনে কথা হয় পাবনা থেকে ঘুরতে আসা কলেজশিক্ষার্থী রিয়াজ মাহমুদের সঙ্গে। তিনি জানান, তিন ঘণ্টার জন্য দেড় হাজার টাকায় একটি ১৫০ সিসির মোটরসাইকেল ভাড়া নেন। ভাড়া নেওয়ার সময় তিনি মোটরসাইকেলের কাগজপত্র দেখতে চাইলে ব্যবসায়ী তাকে জানান, পুলিশের সঙ্গে তাদের মাসিক সমঝোতা রয়েছে, তাই পথে কোনো সমস্যা হবে না।
রিয়াজ বলেন, "আমাদের এলাকায় বৈধ কাগজপত্র ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো সম্ভব নয়। কিন্তু কক্সবাজারে এসে দেখলাম অধিকাংশ রেন্টের বাইকের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। এমনকি অনেক চালক হেলমেট ছাড়াই এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন।"
ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ব্যবসায়ী রবিন হাওলাদার জানান, তিনি ঘণ্টাপ্রতি ৩০০ টাকা ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়েছেন। টেকনাফ যাওয়ার পথে হিমছড়ি এলাকায় পুলিশ তাকে থামালেও মোটরসাইকেল মালিকের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, পুলিশের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের মাসিক চুক্তি রয়েছে বলে তাদের দাবি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রেন্ট-এ-বাইক ব্যবসায়ী বলেন, অবৈধ মোটরসাইকেল পরিচালনাকারীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা সংগ্রহ করা হয়। সমিতির কয়েকজন নেতা বা পুলিশের সোর্স মাস শেষে সেই টাকা সংগ্রহ করে ট্রাফিক পুলিশের কলাতলী বক্স, হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ি, ইনানী পুলিশ ফাঁড়ি এবং রেজুখাল চেকপোস্টে পৌঁছে দেন বলে তিনি দাবি করেন। তবে তিনি এ দাবির পক্ষে কোনো প্রামাণ্য তথ্য উপস্থাপন করেননি।
অভিযোগের বিষয়ে হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক সোমনাথ বসু বলেন, "মোটরসাইকেল বা অন্যান্য যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব। ফাঁড়ি পুলিশ এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করে না। মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগের কোনো প্রমাণ নেই। অন্য কেউ যদি এমন কিছু করে থাকে, তার দায়ভার সে নিজেই বহন করবে।"
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, "রেন্ট-এ-বাইক ব্যবসা থেকে মাসোহারা আদায়ের বিষয়ে আমার জানা নেই। যদি হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।"
কক্সবাজার ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক ( প্রশাসন) টিআই খসরু পারভেজ বলেন, "অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ট্রাফিক বিভাগের নিয়মিত অভিযান চলছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে।" তবে মেরিন ড্রাইভের কোন কোন এলাকায় কবে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে—এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব তিনি দিতে পারেননি।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বলেন, "মেরিন ড্রাইভে অবৈধ মোটরসাইকেল চলাচলের বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছি। এ বিষয়ে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে। তদন্তে যদি কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
পর্যটনসংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের মতে, পর্যটকদের নিরাপত্তা, সড়ক শৃঙ্খলা এবং সরকারের রাজস্ব সুরক্ষার স্বার্থে অবৈধ রেন্ট-এ-বাইক ব্যবসা বন্ধে দ্রুত ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
