

ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাটঃ
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও মানসিক চাপের জেরে ফেসবুক লাইভে এসে লিমন মোল্লা নামের এক যুবক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন, যা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের উমাজুরি গ্রামে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে হৃদয় ওরফে লিমন মোল্লা নামক ছাব্বিশ বছর বয়সী এক যুবক নিজ বাসভবনে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। সিরাজ মোল্লার একমাত্র সন্তান লিমন ঘটনার সময় বাড়িতে একাই অবস্থান করছিলেন। রাত বারোটার দিকে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লাইভ ভিডিওতে যুক্ত হয়ে সবার অগোচরে ঘরের আড়ার সঙ্গে কাপড় পেঁচিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি এই মর্মান্তিক দৃশ্য প্রচার হওয়ার ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে আসে। খবর পেয়ে পুলিশ রাতেই ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করেছে এবং এ ঘটনায় মোরেলগঞ্জ থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক কলহকেই এই আত্মহত্যার মূল অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
নিহতের স্বজন ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ব্যক্তিগত জীবনে লিমন বিবাহিত ছিলেন এবং তার একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে স্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছিল। লিমনের বাবা সিরাজ মোল্লা জানান, আত্মহত্যার ঠিক পূর্বমুহূর্তেও ঢাকায় অবস্থানরত স্ত্রী উর্মির সঙ্গে লিমনের দীর্ঘ বাকবিতণ্ডা হয়। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, স্ত্রীর সঙ্গে মনোমালিন্য এবং তীব্র মানসিক চাপের কারণেই লিমন এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যার মতো ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, মানসিক অবসাদগ্রস্ত ব্যক্তিরা এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিজের ক্ষোভ বা হতাশা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন, যা সমাজ ও পরিবারের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, লিমনের ব্যক্তিগত জীবনের এই অস্থিরতা নিরসনে কোনো পক্ষই কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি, যার ফলে একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ অকালে ঝরে গেল।
মোরেলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহামুদুর রহমান জানিয়েছেন, আত্মহত্যার খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশি তৎপরতা শুরু করা হয় এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে। পুলিশের পক্ষ থেকে এই ঘটনাটিকে পারিবারিক অস্থিরতার একটি চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা এবং পারিবারিক সংঘাত নিরসনে সামাজিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগের অভাব এই ধরনের ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। কাউন্সিলিং বা যথাযথ মনোসামাজিক সহায়তা না পাওয়ায় তরুণ প্রজন্মের একাংশ হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং সচেতন মহল মনে করছে, শুধুমাত্র আইনি পদক্ষেপ নয়, বরং পারিবারিক পর্যায়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
পরিশেষে, ফেসবুকের মতো উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে আত্মহত্যার লাইভ প্রচারের ঘটনা ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নৈতিকতার প্রশ্নে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। লিমনের এই অকাল মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতিই নয়, বরং এটি বর্তমান সময়ের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর ভঙ্গুরতাকে স্পষ্ট করে তোলে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পারিবারিক সংহতি বজায় রাখা এবং বিষণ্নতায় ভোগা ব্যক্তিদের প্রতি বাড়তি নজরদারি ও সহমর্মিতা প্রদর্শনের কোনো বিকল্প নেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনার নেপথ্যে থাকা অন্যান্য কারণগুলো খতিয়ে দেখছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে নিশ্চিত করেছে।
