

তৌসিফ রেজা (সৈয়দপুর) নীলফামারী:
শীতের কনকনে রাত। ঠিকমতো দিনে সূর্যের দেখা মিলছে না। ঘন কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে সৈয়দপুর শহর। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে শীত। দোকানপাট বন্ধ হচ্ছে, রাস্তাঘাটে নেমে আসছে নীরবতা। কিন্তু নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার, পৌরসভা রোডস্থ রোটারী মাঠের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। সেখানে আলো জ্বলছে, ভেসে আসছে ব্যাটে বলের শব্দ, দর্শকদের করতালি আর তরুণদের উচ্ছ্বাস। শীত উপেক্ষা করেই রাতের ক্রিকেটে মেতে উঠেছেন স্থানীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা।
রাত সাড়ে নয়টা। কেউ গায়ে হুডি, কেউ মাফলার পেঁচিয়ে ব্যাটিং করছেন। আবার অন্যরা ব্যস্ত ফিল্ডিংয়ে। ঠান্ডায় হাত শক্ত হয়ে এলেও খেলার উত্তেজনায় তা টের পাচ্ছেন না কেউই। বল ছুটছে বাউন্ডারির দিকে, দর্শক সারিতে উঠছে উল্লাস।
দিনের বেলায় কর্মব্যস্ততার কারণে অনেকেরই মাঠে নামা সম্ভব হয় না। কেউ দোকানে কাজ করেন, কেউ চাকরি বা পড়াশোনায় ব্যস্ত। তাই রাতটাই হয়ে উঠেছে ক্রিকেট খেলার প্রধান সময়। স্থানীয় খেলোয়াড় তানজিম রোমান বলেন,
“দিনে কাজ শেষ করে শরীর ক্লান্ত থাকে। কিন্তু রাতে মাঠে নামলে সব ক্লান্তি চলে যায়। শীত থাকলেও ক্রিকেট ছাড়তে পারি না।”
শীতকালে দিনের কুয়াশার কারণে খেলা ব্যাহত হলেও রাতে তুলনামূলক পরিষ্কার আবহাওয়া পাওয়া যায়। সেই সুযোগেই রোটারী মাঠে নিয়মিত হচ্ছে টেপটেনিস বল ক্রিকেট। অল্প আয়োজন, কম খরচ আর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সুযোগ, সব মিলিয়ে এই ক্রিকেট তরুণদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেক সময় ছোটখাটো টুর্নামেন্টও আয়োজন করা হয়, যেখানে সামান্য পুরস্কার থাকলেও সম্মান আর আনন্দটাই মুখ্য।
এই রাতের ক্রিকেট শুধু খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক সামাজিক মিলনকেন্দ্র। মাঠের চারপাশে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছেন নানা বয়সের মানুষ। কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন, কেউ মোবাইলে ভিডিও ধারণ করছেন, কেউ আবার পরিচিতদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ফকিরা মিয়া বলেন,
“ছেলেরা যদি মাঠে থাকে, তাহলে অন্তত খারাপ আড্ডায় যায় না। খেলাধুলার মধ্যে থাকাই ভালো।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত খেলাধুলা তরুণদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে যখন মোবাইল আসক্তি ও হতাশা বাড়ছে, তখন এই রাতের ক্রিকেট অনেকের জন্য হয়ে উঠেছে মানসিক স্বস্তির জায়গা। মাঠে দৌড়ঝাঁপ, দলগত কাজ আর প্রতিযোগিতা তরুণদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলছে।
তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। শীতের রাতে খেলতে গিয়ে অনেকেই সর্দি-কাশি বা জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে চোট পাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। আবার শব্দ নিয়ে আশপাশের বাসিন্দাদের বিরক্তির কথাও শোনা যায়। তবুও খেলোয়াড়দের আগ্রহ কমছে না।
শীত যতই কনকনে হোক, সৈয়দপুরের রোটারী মাঠে ক্রিকেটের উত্তাপ কমে না। আলো-আঁধারির এই মাঠে শুধু একটি খেলা নয় গড়ে উঠছে বন্ধুত্ব, ভাঙছে একঘেয়েমি, জন্ম নিচ্ছে নতুন স্বপ্ন। রাতের এই ক্রিকেটই প্রমাণ করে, খেলাধুলা থেমে থাকে না; সময় আর ঋতুকে অতিক্রম করেই এগিয়ে চলে।
