

এস এম আওলাদ হোসেন,সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
লক্ষ্মীপুর কি আবারও রক্তাক্ত জনপদে পরিণত হচ্ছে? একের পর এক হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্যে গুলি, মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ, মাটির ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সংঘাত এবং সন্ত্রাসী আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পার্বতীনগর ইউনিয়নের দিলসাদপুর, ভাংগাখাঁ ইউনিয়নের রাধাপুর এবং চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো ঘিরে জনমনে আতঙ্কের প্রশ্নটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এটি কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ডের বিষয় নয়; বরং অপরাধের অর্থনীতি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার সক্ষমতা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময়।
গত ২৮ অক্টোবর লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পার্বতীনগর ইউনিয়নের দিলসাদপুর এলাকায় খোরশেদ আলমকে গুলি করে হত্যার ঘটনা জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাটির ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে নিহতের পরিবারের অভিযোগ। ঘটনার পর পুলিশ দুজনকে আটক করার তথ্যও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
তবে হত্যার প্রকৃত কারণ, প্রত্যেকের ভূমিকা এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার। । মাটির ব্যবসা নিজে অপরাধ নয়। কিন্তু মাটি কাটার অনুমতি, জমির মালিকানা, পরিবেশগত বিধিনিষেধ, পরিবহন এবং ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে যদি সশস্ত্র বিরোধ তৈরি হয়, তাহলে সেটি শুধু ব্যবসায়িক বিরোধ থাকে না—তা জননিরাপত্তার সংকটে রূপ নেয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, বিরোধের সূত্রপাত হওয়ার পর কোনো পক্ষ কি হুমকি দিয়েছিল? অস্ত্র প্রদর্শনের খবর কি আগে পাওয়া গিয়েছিল? স্থানীয়ভাবে সালিশ বা অভিযোগের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে এসেছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের পথও স্পষ্ট হতে পারে। লক্ষ্মীপুরে মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের উদ্বেগ নতুন নয়।
২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল প্রকাশিত খবরের কাগজ-এর এক প্রতিবেদনে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, আগের এক বছরে মাদক কারবার ও সেবনকে কেন্দ্র করে জেলায় ২০ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। একই প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৫৪৫টি অভিযান, ১১৬টি মামলা এবং ১২৫ জনকে আটকের তথ্য উল্লেখ করা হয়। । এ পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অনেক। তবে ২০টি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে মাদকের সংশ্লিষ্টতা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, প্রতিটি ঘটনায় মামলা ও তদন্তের অবস্থা কী—সেসব তথ্য সরকারি নথি দিয়ে আরও যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, লক্ষ্মীপুরে ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে ২০৮টি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্য একটি আইনশৃঙ্খলা পর্যালোচনা সভার বরাতে প্রথম আলো প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে ৬৬টি ছিল মাদকসংক্রান্ত অপরাধ। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৯৮৭টি অভিযানের কথাও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এই তথ্যগুলো ইঙ্গিত দেয়, অভিযান ও মামলা পরিচালনার পাশাপাশি মাদকের সরবরাহব্যবস্থা, অর্থের উৎস, পাইকারি বিক্রেতা, স্থানীয় পরিবেশক এবং অপরাধে সহায়তাকারীদের শনাক্ত করার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। শুধু খুচরা পর্যায়ে মাদক উদ্ধার করে অভিযান শেষ করলে অপরাধের মূল অর্থনৈতিক কাঠামো অক্ষত থেকে যেতে পারে। প্রয়োজন আর্থিক লেনদেনের আইনসম্মত অনুসন্ধান, প্রমাণভিত্তিক তদন্ত এবং আদালতে টেকসই অভিযোগপত্র দাখিল।
পার্বতীনগরের দিলসাদপুর, ভাংগাখাঁর রাধাপুর এবং বশিকপুরের বালাশপুর সীমান্তবর্তী এলাকার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবে এসব এলাকায় সংঘটিত প্রতিটি অপরাধ একই চক্রের কাজ কিংবা সব ঘটনার পেছনে একই উদ্দেশ্য রয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণ ছাড়া দেওয়া যায় না। তবু অপরাধের ধরন, ভৌগোলিক নৈকট্য, সম্ভাব্য যাতায়াতপথ, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং একই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার তথ্য থাকলে সেগুলো সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
কোনো অপরাধী গোষ্ঠী যদি একটি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে অন্য এলাকায় কার্যক্রম বাড়ানোর চেষ্টা করে, তাহলে বিচ্ছিন্ন থানা-ভিত্তিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রয়োজন সদর থানা ও চন্দ্রগঞ্জ থানাসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ অভিযান এবং অপরাধের নেটওয়ার্কভিত্তিক তদন্ত। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ ব্যবস্থা, সাক্ষীদের সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে হত্যা, অবৈধ অস্ত্র, মাদক কারবার এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু আইনের অস্তিত্ব আর আইনের কার্যকর প্রয়োগ এক বিষয় নয়। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-ধারা ৩০২ অনুযায়ী হত্যার দায়ে দোষী ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ধারা ৩৪ যৌথ অভিপ্রায়ে সংঘটিত অপরাধের দায় নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে ধারা ১২০বি-ও প্রযোজ্য হতে পারে—তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপাদান ও প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অস্ত্র আইন-১৮৭৮: অবৈধ অস্ত্র রাখা, বহন বা ব্যবহারসংক্রান্ত অপরাধে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার, ব্যালিস্টিক পরীক্ষা, গুলির খোসা সংগ্রহ এবং ফরেনসিক আলামত সংরক্ষণ তদন্তকে শক্তিশালী করতে পারে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮: মাদকদ্রব্যের অবৈধ উৎপাদন, বহন, সংরক্ষণ, বিক্রি ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে এই আইনের প্রযোজ্য ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শুধু মাদক উদ্ধার নয়, সরবরাহকারী ও অর্থায়নকারীদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। মাটি কাটার ধরন, জমির শ্রেণি, স্থান, উদ্দেশ্য এবং অনুমতির ওপর নির্ভর করে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর প্রাসঙ্গিক বিধান বিবেচনায় আসতে পারে। তবে সব ধরনের মাটি কাটাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই আইনের আওতাভুক্ত বলা যাবে না; নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্য ও আইনগত শর্ত যাচাই করতে হবে।
এসব আইনের প্রয়োগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা না করা, আবার প্রভাবশালী পরিচয়ের কারণে কারও বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ব্যাহত হতে না দেওয়া। লক্ষ্মীপুরে সহিংসতা কমাতে কয়েকটি পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্তের অগ্রগতি জনসমক্ষে নিয়মিত তুলে ধরতে হবে। কোথায় কতটি মামলা হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, কী ধরনের আলামত উদ্ধার হয়েছে এবং অভিযোগপত্র দাখিলের অগ্রগতি কী—আইনগত সীমাবদ্ধতা বজায় রেখে এসব তথ্য প্রকাশ করা দরকার।
দ্বিতীয়ত, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের উৎস শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস, অর্থের প্রবাহ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধে সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকা তদন্তে আনতে হবে। তৃতীয়ত, মাটির ব্যবসা ও মাটি উত্তোলনসংক্রান্ত বিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তদারকি প্রয়োজন। অনুমতিবিহীন কার্যক্রম থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ব্যবসায়িক বিরোধের আড়ালে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। চতুর্থত, যেসব এলাকায় হত্যার হুমকি, চাঁদাবাজি, অস্ত্র প্রদর্শন বা সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, সেসব এলাকায় ঝুঁকিভিত্তিক টহল, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
পঞ্চমত, সাক্ষী ও অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ভয়ভীতি বা প্রভাবের কারণে কেউ সাক্ষ্য দিতে না পারলে বিচারপ্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি মামলা তদন্তে গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একটি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিচার করতে শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা দেখলেই চলে না। দেখতে হয় মানুষ কতটা নিরাপদ, অপরাধের পুনরাবৃত্তি কমছে কি না, মামলার তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ এবং বিচার কতটা কার্যকর হচ্ছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে পূর্বে হত্যা, অস্ত্র বা মাদকসংক্রান্ত মামলা থাকলেও তার বিরুদ্ধে নতুন অপরাধের অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় না। একইভাবে অপরাধের অভিযোগে কেউ প্রভাবশালী হলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করা যাবে না। আইনের শাসন মানে—প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীর বিচার এবং নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার রক্ষা। লক্ষ্মীপুরের মানুষ শান্তি চায়, নিরাপত্তা চায়, স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা চায়।
তারা চায় না, মাটির ব্যবসা, মাদক কারবার কিংবা আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে কোনো পরিবারকে স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে বেঁচে থাকতে হোক। লক্ষ্মীপুরকে শান্ত করতে হলে শুধু হত্যার পর অভিযান চালালে চলবে না; হত্যার আগেই অপরাধের ঝুঁকি শনাক্ত করতে হবে। মাদকের অর্থনীতি, অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক এবং প্রভাব খাটিয়ে অপরাধ আড়াল করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সচেতন নাগরিক—সব পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। তবে আইন প্রয়োগের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। সেই দায়িত্ব পালনে কোনো পক্ষপাত, শৈথিল্য কিংবা নির্বাচিত প্রয়োগের সুযোগ থাকা উচিত নয়।
লক্ষ্মীপুরের মানুষ আর রক্তাক্ত শিরোনাম দেখতে চায় না। তারা চায় এমন একটি জনপদ, যেখানে বিরোধের সমাধান হবে আইনে, ব্যবসা চলবে বৈধ নিয়মে, অপরাধের বিচার হবে আদালতে এবং মানুষের জীবন থাকবে সুরক্ষিত। এখন প্রশ্ন একটাই—আর কত রক্ত ঝরলে লক্ষ্মীপুরে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর, সমন্বিত এবং জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে ?
