

এস এম আওলাদ হোসেন, সিনিয়র রিপোর্টার।।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা ভূমি অফিসে ভূমি লিজের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন দুই কর্মচারী। তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে চিহ্নিত ১২ লাখ ৭ হাজার ৯১০ টাকা ইতিমধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন প্রধান সহকারী কাম-হিসাবরক্ষক জাহাঙ্গীর আলম এবং সার্টিফিকেট পেশকার (নাজির) মো. নকিব হোসেন শান্ত। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরের হিসাব তত্ত্বাবধায়কের অডিটে অর্থ জমা না দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে আদান-প্রদান করা চিঠিপত্রের কপি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে চান্দিনা ভিটির একসনা লিজমানি বাবদ ১ লাখ ৯ হাজার ১৩০ টাকা এবং ভিপি লিজমানির নথি বাবদ ১০ লাখ ৯৮ হাজার ৭৮০ টাকা আদায় করা হয়। কিন্তু আদায় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। দুই খাতের মোট অর্থের পরিমাণ ১২ লাখ ৭ হাজার ৯১০ টাকা।
এ ঘটনায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসককে অর্থ উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় লক্ষ্মীপুরের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর মো. হাবিবুর রহমান গত ৪ অক্টোবর রায়পুরের সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) চিঠি দেন। চিঠিতে সংশ্লিষ্ট অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এর আগে রায়পুরের সদ্য বিদায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা গত ৯ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত দুই কর্মচারীকে অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ যথাসময়ে কোষাগারে জমা না করার বিষয়ে তাঁদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩ ধারার (ঘ) ও (ঙ) উপধারার আলোকে কেন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে নোটিশ দেওয়া হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন লক্ষ্মীপুরের হিসাব তত্ত্বাবধায়ক মো. মনজুরুল আলম গত ৯ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেন, দুটি ডিসিআর (ডিমান্ড কালেকশন রেজিস্টার) বইয়ের মাধ্যমে জাহাঙ্গীর আলম ওই অর্থ আদায় করেন। অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় সার্টিফিকেট পেশকার (নাজির) মো. নকিব হোসেন শান্তর যোগসাজশ রয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে অর্থ আদায় ও সরকারি কোষাগারে জমার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে মিথ্যা বিবরণী দাখিল করে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে সহযোগিতা করেন নকিব হোসেন শান্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার কর্মস্থলে গিয়েও প্রধান সহকারী কাম-হিসাবরক্ষক জাহাঙ্গীর আলমকে পাওয়া যায়নি। তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। বর্তমানে তিনি রামগতি উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত রয়েছেন।
অন্যদিকে সার্টিফিকেট পেশকার (নাজির) মো. নকিব হোসেন শান্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “জাহাঙ্গীর আলমকে বিশ্বাস করে আমি প্রতিমাসের টাকা প্রতিমাসে জমা হয়েছে মর্মে উপজেলা ও জেলা কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। আমি কোনো টাকা আত্মসাৎ করিনি। আমি আমার নোটিশের জবাব দিয়েছি। কর্তৃপক্ষ পরবর্তী বিষয়টি দেখবেন।”
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, “টাকা ইতিমধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়েছে। বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহবুব হাসানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁদের কাছে খুদে বার্তাও পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সরকারি রাজস্ব আদায় ও জমার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত জমা হলেও কীভাবে এত বিপুল অঙ্কের অর্থ দীর্ঘ সময় জমা না থেকে গেল, তদারকির দায়িত্বে কার কী ভূমিকা ছিল এবং অভিযোগের দায় কার কতটুকু—তা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিভাগীয় প্রক্রিয়ার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
