ঢাকা
প্রকাশিত : October 3, 2026
আপডেট: October 3, 2026
প্রকাশিত : October 3, 2026

বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ বন্ধ, দিশেহারা দুই হাজার শ্রমিক

এস এম আওলাদ হোসেন, সিনিয়র রিপোর্টার।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে দীর্ঘ দুই দশক ধরে চালু থাকা বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন প্রায় দুই হাজার শ্রমিক। টানা পাঁচ মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া থাকা অবস্থায় কর্মসংস্থান হারিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তারা। বিশেষ করে নারী, বিধবা ও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম শ্রমিকদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।

রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের রাখালিয়া এলাকায় অবস্থিত কারখানাটির ফটকে চলতি বছরের ১৫ মে স্থায়ীভাবে বন্ধের নোটিশ ঝুলিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকে কর্মহীন শ্রমিকদের অনেকেই বিকল্প কাজের সন্ধানে ঘুরছেন। কেউ সামান্য সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন, আবার কেউ ধারদেনা করে দিন পার করছেন।

গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেলে কারখানা এলাকায় কথা হয় রহিমা আক্তার (ছদ্মনাম), সুমি আক্তারসহ অন্তত ১২ জন শ্রমিকের সঙ্গে। তাদের প্রত্যেকের গল্পে উঠে আসে একই ধরনের হতাশা ও অনিশ্চয়তার চিত্র।

রহিমার বয়স ৩৫ বছর। প্রায় ১০ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর কলেজপড়ুয়া দুই মেয়ে ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নেন তিনি। স্বজনের সহযোগিতায় বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজে মাসিক ছয় হাজার টাকা বেতনে কাজ পান। স্বল্প আয়ের সেই চাকরিই ছিল চার সদস্যের পরিবারের প্রধান অবলম্বন। কিন্তু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন সংসার চালানোই তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

রহিমার মতো অনেক নারী শ্রমিকেরও একই অবস্থা। সোনাপুর এলাকার শ্রমিক সুমি আক্তার বলেন, “পুরুষ শ্রমিকদের অনেকে অন্যত্র নতুন কাজ পেয়েছেন। কিন্তু আমরা যুবতী ও মধ্যবয়সী নারীরা কোথাও কাজ পাচ্ছি না। বিসিক শিল্পনগরীতেও যোগাযোগ করেছি, কোনো ব্যবস্থা হয়নি। বিধবা বা একার আয়ে চলা নারীদের টিকে থাকাই এখন দায়।”

শ্রমিকরা জানান, কারখানা বন্ধ হওয়ার আগে থেকেই তারা বেতন-ভাতা নিয়ে সংকটে ছিলেন। প্রায় পাঁচ মাসের বেতন বকেয়া থাকার পর হঠাৎ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বকেয়া পাওনা আদায় এবং কারখানা পুনরায় চালুর দাবিতে শ্রমিকরা বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ ও কর্মসূচিও পালন করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাসুম, হাবিবুর রহমান ও মানিক হোসেন জানান, কারখানাটিকে ঘিরে শুধু শ্রমিকদের পরিবার নয়, আশপাশের বহু ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গড়ে উঠেছিল। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর সেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

শ্রমিকদের ভাষ্য, পুরুষদের কেউ কেউ দিনমজুরি, পরিবহন কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ পেলেও আগের তুলনায় আয় অনেক কম। অন্যদিকে নারী শ্রমিকদের জন্য স্থানীয়ভাবে কাজের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে অনেক পরিবারে খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা ও চিকিৎসা ব্যয় চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

কারখানা বন্ধের কারণ হিসেবে ব্যাংকিং জটিলতা ও আর্থিক সংকটের কথা জানিয়েছে মালিকপক্ষ। বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী টিপু সুলতান এবং সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) বিপ্লব পাল মুঠোফোনে বলেন, “বিগত ২০ বছর ধরে লাভ-ক্ষতির হিসাব মিলিয়ে আমরা কারখানাটি চালিয়ে আসছিলাম। ব্যাক টু ব্যাক এলসি সুবিধা বন্ধ হওয়া ও ব্যাংকিং জটিলতার কারণে আমরা নিরুপায় হয়ে পড়েছি।”

তারা আরও বলেন, “সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের অনুরোধ, ব্যাংকিং সুবিধা পুনরুজ্জীবিত করে লে-অফ তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।”

রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, ব্যাংকিং সুবিধাজনিত সংকটের কারণে কারখানাটি বন্ধ হয়েছে বলে তিনি জেনেছেন। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয়ে কয়েক দফা বৈঠক করে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত মালিকপক্ষ কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করে।

কারখানাটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন রায়পুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মারুফ বিন জাকারিয়া। তিনি বলেন, “হাজারো পরিবারের স্বচ্ছলতা এই কারখানার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এটি বন্ধ হওয়ায় বিরাট একটি জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়েছে। কর্মসংস্থান রক্ষায় সরকারের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে স্থানীয় বাজার, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ভাড়া বাসা এবং বিভিন্ন সেবাখাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ পুনরায় চালু করা সম্ভব হলে একদিকে যেমন শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ফিরবে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি ফিরতে পারে।

লক্ষ্মীপুরে নিবন্ধিত অর্ধশতাধিক কারখানা থাকলেও বড় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখন শ্রমিকদের দাবি—বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ, দ্রুত কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ এবং নারী শ্রমিকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

সর্বশেষ
প্রকাশক ও সম্পাদক - সিকদার সাদেকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক- জাহিদুল হাসান জাহিদ
কার্যালয়ঃ ৪ দারুসসালাম রোড, মিরপুর, ঢাকা।
aazkaalbangla@gmail.com
মোবাইলঃ +8801842280000
আজকাল বাংলা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2021-2025 AjkalBangla.Com All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram