

ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট।্
বাগেরহাটের রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিড ও স্থানীয় পর্যায়ে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বাগেরহাটের রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটটি হুট করে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে, যার ফলে জাতীয় গ্রিড ও স্থানীয় অঞ্চলে তীব্র লোডশেডিং শুরু হয়েছে। গত রোববার সকালে বয়লার অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ কারিগরি জটিলতা দেখা দেওয়ায় ১ হাজার ১০০ মেگاওয়াট উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন এই মেগা প্রকল্পের একটি ইউনিট আকস্মিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে কেন্দ্রটির সার্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এক লাফে অর্ধেকে নেমে এসে ৬০০ মেগাওয়াটের নিচে ঠেকেছে। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগের এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটিতে পর্যাপ্ত কয়লার মজুত থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র কারিগরি ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণে এমন বিপর্যয় দেখা দেওয়ায় বিদ্যুৎ খাতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রামপালের এই ২ নম্বর ইউনিটটি বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন জাতীয় গ্রিডের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ের শিল্প ও জনজীবনে তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
উদ্ভূত এই সংকট সমাধানে ভারত থেকে দুজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী আসার কথা থাকলেও বুধবার পর্যন্ত তারা এসে পৌঁছাননি, যা প্ল্যান্টটির রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতাকে স্পষ্ট করে তোলে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হওয়া ইউনিটটি বর্তমানে ঠান্ডা বা কুল ডাউন করার ধীরগতির প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। দেশীয় প্রকৌশলীরা প্রাথমিক কাজ শুরু করলেও জটিল প্রযুক্তিগত এই কাজটির পূর্ণাঙ্গ সমাপ্তি এবং বয়লারের বাকি কাজ সম্পন্ন করার জন্য ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে। রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা আনোয়ারুল আজিম জানিয়েছেন যে প্রকৌশলীরা পৌঁছানোর পর কাজ এগোবে, তবে উৎপাদন কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ দিতে পারেনি। প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে, যা চরম অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে হঠাৎ এই ধস নামার কারণে বাগেরহাটসহ আশপাশের অঞ্চলগুলোতে গ্রাহকরা অসহনীয় লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন এবং তীব্র গরমের মধ্যে সাধারণ মানুষের জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কর্তৃপক্ষের এই ধীরগতি ও আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অভাবে সাধারণ গ্রাহকদের নিয়মিত ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুভোর্গজনক। একদিকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরতা এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ কারিগরি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা—উভয় মিলে এই মেগা প্রকল্পের টেকসই উৎপাদন ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে অবিলম্বে প্ল্যান্টের ত্রুটি দূর করে পূর্ণ উৎপাদনে ফেরার দাবি জানিয়েছেন। গ্রিড ব্যবস্থাপনার এই ভঙ্গুর দশা থেকে বের হয়ে আসতে হলে রামপাল কর্তৃপক্ষের উচিত দেশীয় প্রকৌশলীদের আরও দক্ষ করে তোলা এবং এ ধরনের আকস্মিক বিপর্যয় রোধে কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই আকস্মিক ইউনিট বন্ধের ঘটনাটি আমাদের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সামান্য কারিগরি ত্রুটির অজুহাতে একটি মেগা প্রজেক্টের উৎপাদন এভাবে অর্ধেকে নেমে আসা এবং তা মেরামতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করা দেশের জ্বালানি খাতের স্বয়ংসম্পূর্ণতার অভাবকে ফুটিয়ে তোলে। এই ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে শুধু স্থানীয় জনজীবনই নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি ও শিল্পায়ন মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও পিডিবিকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি এড়াতে কঠোর মনিটরিং এবং দ্রুত রেসপন্স টিম গঠন করতে হবে, যাতে সাধারণ গ্রাহকদের এই অহেতুক লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগ থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করা যায়।
