

আবু তাহের, গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন মুখে মুখে প্রতিনিয়ত ফিরছে মাদক বিস্তারের খবর। হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক, আর এর কবলে পড়ে ধ্বংসের মুখে ধাবিত হচ্ছে স্থানীয় যুবসমাজ। তবে এক অদ্ভুত নীরবতা গ্রাস করেছে পুরো উপজেলাকে। মাদক বিক্রেতা এবং সেবনকারীদের বড় একটি অংশ প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হওয়ায়, তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। "জেনেও না জানার ভান" করে থাকাটাই এখন অনেকের কাছে নিরাপদ মনে করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, থানা পুলিশ মাঝে মধ্যে মাদককারবারি চুনোপুঁটিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করলেও মাদকসম্রাটরা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও সম্রাটরা তাদের অদৃশ্য শক্তিতে কৌশল অবলম্বন করে তাদের পাইকারি খরিদ্দারদের জেলথেকে উদ্ধারে কাজ করে। কিছুদিন যেতে না যেতেই আইনের ফাঁকফোকর গলে খুব অল্প দিনেই তারা জামিনে বেরিয়ে আসছে। জামিন পাওয়ার পর মাদককারবারিদের ভাব বেড়ে যায় সেই সাথে অপরাধের মাত্রা ও বাড়াতে থাকে। এমনকি মাদককারবারিরা নিজেদের আড়াল করতে অন্যের বাড়িতে গোপনে মাদক রেখে ব্যবসা চালানোর মতো ভয়ঙ্কর প্রবণতার কথাও লোকমুখে শোনা যাচ্ছে।
সম্প্রতি মাদক প্রতিরোধে উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ‘মাদকবিরোধী কমিটি’ গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে মাঠপর্যায়ে এই কমিটিগুলোর তেমন কোনো কার্যকারিতা বা দৃশ্যমান তৎপরতা চোখে পড়ছে না। ফলে লোকমুখে এখন এই কমিটিগুলোর আন্তরিকতা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সচেতন মহল মনে করেন, কেবল প্রথাগত অভিযানে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ। তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ও পরামর্শ তুলে ধরতে বলেন সাংবাদিকদের :
পুলিশের উচিত প্রতি গ্রামে মাদকবিরোধী বৈঠক করে চিহ্নিত মাদককারবারি ও সেবনকারীদের তালিকা তৈরি করা এবং তা জনসম্মুখে (যেমন—হাটবাজার বা ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ বোর্ডে) প্রচার করা। এতে সামাজিক লজ্জার মুখে বা পরিবারের চাপে পড়ে অনেকেই এই খারাপ পথ ছাড়তে বাধ্য হবে।
যারা মাদক ব্যবসা বা সেবন ছেড়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করবে, তাদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নজরদারি বজায় রাখতে হবে।
একই সাথে চুনোপুঁটিদের জবানবন্দি নিয়ে রাঘববোয়ালদের ধরতে হবে। মাদকের শেকড়ের সন্ধান না করতে পারায় একসময় মাদকসেবিরা ব্যবসায়ী সেঁজে আবার নতুন নতুন যুবকদের সাথে মিলে মিশে তাদেরকে কুপথে ধাবিত করছে।
কারণ অতীতে এই উপজেলার শতাধিক মাদককারবারিকে মাদকব্যবসা ছেড়ে দিয়ে ভালো হবার অঙ্গীকার থানায় গিয়ে করলেও এখনো তারা চুটিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে একাধিক সুত্রে জানা গেছে।
বিজ্ঞ আদালতের প্রতি সচেতন মহলের আহ্বান—মাদক মামলায় যারা দ্বিতীয়বার বা বারবার ধরা পড়বে, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত হলে অপরাধীরা কিছুটা হলেও দমে যাবে।
সামগ্রিক বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ভিন্ন এক সংকটের কথা জানান। পুলিশের দাবি—"সবাই মাদকের বিরুদ্ধে মুখে বড় বড় কথা বললেও, মাদককারবারিকে হাতেনাতে ধরার পর স্থানীয় কোনো সাক্ষী পাওয়া যায় না।" অনেকে ভয়ে বা চেনা-জানার খাতিরে কাগজে সই করতে চান না। আর যারাও বা পুলিশি তদন্তে সাক্ষী দেন, পরবর্তীতে বিজ্ঞ আদালতে গিয়ে তারা এমনভাবে ‘গা বাঁচানো’ সাক্ষ্য দেন যে আইনের চোখে অপরাধ প্রমাণিত হয় না। ফলে পার পেয়ে যায় মাদককারবারিদের মত জঘন্য অপরাধীরা।
অনেকেই বলেন, সাঘাটায় মাদকের এই মরণনেশা বন্ধ করতে হলে সাঘাটার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে যমুনার চরাঞ্চল ও নদীপথ ব্যবহার করে মাদক প্রবেশের রুটগুলো চিহ্নিত করে থানা পুলিশ ও নৌ-পুলিশের সমন্বিত টহল বাড়াতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রতিটি মসজিদ, মন্দির এবং স্কুল-কলেজে মাদকবিরোধী নিয়মিত আলোচনা ও সচেতনতামূলক বক্তব্য বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
এই মাদকের কারণেই সমাজে পারিবারিক অশান্তি, চুরি, খুন খারাপিসহ নানান অসামাজিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই মুহুর্তেই মাদক নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে আইনশৃংখলা পরিস্থতির অবনতি ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাবে না।
সাঘাটাবাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসন, আদালত, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ জনগণ—সবাই মিলে একে অপরকে দেয়া দোষারোপ বন্ধ করে যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে, তবেই সাঘাটাকে মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা সম্ভব।
