

এস এম আওলাদ হোসেন।
নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিন সাধারণত জনগণের প্রত্যাশা, অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং শাসনব্যবস্থার দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই সময়কালকে ঘিরে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দাবি করেছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ৬০৫ জন নিহত হয়েছে। একই সময়ে সংঘটিত হয়েছে অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঘটনা।
তবে এই পরিসংখ্যানকে কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের উপাদান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—এ ধরনের তথ্য আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি সম্পর্কে কী বার্তা দেয় ?
টিআইবির প্রতিবেদনে একদিকে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়েছে, যেমন সংসদ সদস্যদের কিছু বিশেষ সুবিধা বাতিল, ভিভিআইপি সংস্কৃতি কমানোর উদ্যোগ এবং বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে পদক্ষেপ। অন্যদিকে তারা অভিযোগ করেছে যে, সুশাসন ও দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সংস্কার কার্যক্রম দৃশ্যমান নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে রয়েছে শত শত পরিবার, অসংখ্য স্বপ্ন এবং নিরাপত্তাহীনতার বোধ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। ফলে অপরাধের মাত্রা বেড়ে গেলে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। টিআইবির তথ্য একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক মূল্যায়ন, যা সরকারি পরিসংখ্যান নয়। তাই এসব তথ্য নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের তর্কের পরিবর্তে প্রয়োজন স্বাধীন ও স্বচ্ছ যাচাই। যদি তথ্যগুলো বাস্তবতার প্রতিফলন হয়, তাহলে সরকারের উচিত দ্রুত কারণ অনুসন্ধান করে কার্যকর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আর যদি তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকে, তাহলে সরকারকেও গ্রহণযোগ্য তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করে জনগণকে অবহিত করতে হবে। গণতন্ত্রে তথ্যের জবাব তথ্য দিয়েই দিতে হয়।
টিআইবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা। দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে সুশাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করে আসছে। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের সামনে এখনও যথেষ্ট সময় রয়েছে। কিন্তু প্রথম ১০০ দিনের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়; প্রয়োজন সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত মূল্যায়ন ১০০ দিনে সম্ভব নয়। তবে এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ একটি সতর্কবার্তা অবশ্যই দেয়—সুশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও জবাবদিহির প্রশ্নে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আরও দৃশ্যমান, কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। অন্যথায় প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান ক্রমেই বাড়তে থাকবে, যা গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কখনোই শুভ নয়।
