

তৌসিফ রেজা, সৈয়দপুর (নীলফামারী):
নীলফামারীর সৈয়দপুরে আধ্যাত্মিক আবহে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশাল ও ঐতিহাসিক শানে রিসালাত ইন্টারন্যাশনাল সুন্নি কনফারেন্স। রবিবার (১২ এপ্রিল) মাগরিব নামাজের পর শুরু হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলে ওই মহাসম্মেলন, যা ধর্মীয় আবেগ, ভালোবাসা ও ঐক্যের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়।
সৈয়দপুরের ঐতিহ্যবাহী বাংলা হাইস্কুল মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে সৈয়দপুরসহ আশপাশের শহর থেকে আগত মুসল্লিদের উপস্থিতিতে। আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকে দলে দলে মানুষ সমবেত হতে থাকেন, যার ফলে পুরো এলাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
সম্মেলনে প্রধান মেহমান ও মুখ্য বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত ইসলামিক স্কলার, প্রখ্যাত দাঈ এবং পাকিস্তানের ইদারাতুল মুস্তফা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা পীরজাদা মুহাম্মদ রাযা সাকিব মুস্তাফায়ী (হাফিজাহুল্লাহ)। বাংলাদেশে এটি ছিল তাঁর প্রথম সফর, যা ঘিরে সাধারণ মুসলমানদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয় ।
তার হৃদয়গ্রাহী, যুক্তিপূর্ণ ও আবেগময় বয়ানে তিনি মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থা, দ্বীনের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আজ মুসলিম উম্মাহ নানা বিভক্তি ও দুর্বলতার মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো রাসূল (সা.)-এর আদর্শে ফিরে আসা, নিজেদের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করা এবং এক আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা।
তিনি আরও বলেন, নবীজি (সা.) আমাদের যা করতে নির্দেশ দিয়েছেন, তা আন্তরিকভাবে পালন করতে হবে এবং যা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন, তা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং এটি মুসলমানের জীবনের ভিত্তি। নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ মুসলমানরা যদি নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়াতে পারে, তাহলে কোনো শক্তিই তাদের পরাজিত করতে পারবে না। আজ আমাদের প্রয়োজন পারস্পরিক সহনশীলতা, ভালোবাসা এবং ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন দেশের প্রখ্যাত ইসলামিক ব্যক্তিত্ব, মোনাজেরে আহলে সুন্নাত, দিনাজপুর ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ফখরে বাঙাল ড. সৈয়্যদ এরশাদ আহমেদ বোখারী ।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সৈয়দপুর শহর জামায়াতের আমির শরফুদ্দিন খান,শাহবাজ উদ্দিন সবুজ সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহীন আকতার শাহীন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেন পাপ্পু,সৈয়দপুর শহর জামায়াতের আমির শরফুদ্দিন খান,শাহবাজ উদ্দিন সবুজসহ স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ববৃন্দ।
এছাড়াও মাওলানা আবুল খায়ের রিজভীসহ সৈয়দপুরের বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, খতিব, পীর-মাশায়েখ এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অসংখ্য উলামায়ে কেরাম সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।
বক্তারা বলেন, মুসলিম বিশ্ব আজ নানা সংকটের মুখোমুখি। যদি মুসলিম রাষ্ট্রগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারে, তাহলে বৈশ্বিক পর্যায়ে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। বক্তারা মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং নিরীহ মুসলমানদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানান। তারা বলেন, এখুনি সময় সৌদি আরব, ইরান, ইউএই, ইরাক, কাতার, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, তুরস্কসহ ৫৭ মুসলিম রাষ্ট্রকে নিয়ে মুসলিম ন্যাটো গঠন করে আগ্রাসনকারী ইসরাইল আমেরিকাকে জবাব দেওয়ার। সেই সাথে মসলিমদের সকল মতভেদ ভুলে এক কাতারে এসে পশ্চিমাদের মোকাবেলার আহবান জানান।
গাউসিয়া ইসলামিক মিশন বাংলাদেশ-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই মহাসম্মেলন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে মাহফিল আয়োজক কমিটির আজহার সুলতান রিজভী, শেখ কুতুব উদ্দিন, শাকির, ফাহিম, নাদের, খালিদসহ শত শত স্বেচ্ছাসেবক নিরলসভাবে কাজ করেন।
আয়োজকরা জানান, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা পৌঁছে দিতেই এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন মত ও পথের মানুষ একত্রিত হয়ে যে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, সেটিই এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
তারা আশা প্রকাশ করেন, পীরজাদা রাযা সাকিব মুস্তাফায়ীর এই সফর বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় মানুষের মাঝে নতুন করে ধর্মীয় জাগরণ সৃষ্টি করবে এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
