ঢাকা
৩রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ৯:৩৩
প্রকাশিত : আগস্ট ৩, ২০২৬
আপডেট: আগস্ট ৩, ২০২৬
প্রকাশিত : আগস্ট ৩, ২০২৬

ঠাকুরগাঁওয়ে পুকুরে ডুবে সাত মাসে ৪৭ জনের প্রাণহানি!

সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, ঠাকুরগাঁও:

নদী ও পুকুরবেষ্টিত ঠাকুরগাঁও জেলায় ভরা বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। জেলার ৩৬টি নদের ৬৯২ দশমিক ৪ কিলোমিটার নদীপথ এবং প্রায় ২১ হাজার পুকুর-জলাশয় যেন স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বিষাদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর পেলেই স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের কাছে উদ্ধার সহায়তার আকুতি জানান স্বজনেরা। কিন্তু জেলায় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পাঁচটি কেন্দ্র থাকলেও কোনো ডুবুরি দল না থাকায় দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। উপায়ান্তর না দেখে খবর দেওয়া হয় বিভাগীয় শহর রংপুরের ডুবুরি দলকে। সেখান থেকে ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ বিলম্বের কারণে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়ে যায় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বজনদের হাতে তুলে দিতে হয় নিথর দেহ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রংপুরের ডুবুরি দল যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, ততক্ষণে আর কাউকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। নদী থেকে কেবল মরদেহ তুলে আনা ছাড়া ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের আর করার কিছু থাকে না। জেলা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলা শহরে অবস্থিত ঠাকুরগাঁও ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৬৯ সালে। বর্তমানে জেলায় দ্বিতীয় শ্রেণির পাঁচটি ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স স্টেশনে কর্মকর্তা-কর্মচারীর ১৩১টি অনুমোদিত পদ রয়েছে। তবে দীর্ঘ সাড়ে চার দশকেও এসব স্টেশনের একটিতেও উদ্ধারকারী ডুবুরির কোনো স্বীকৃত পদ সৃষ্টি করা হয়নি। উদ্ধার অভিযানে বিলম্ব ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে জেলা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সাহিদুল ইসলাম বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে বর্তমানে ফায়ার সার্ভিসের কোনো ডুবুরি পদ নেই। এ কারনে নদীতে বা বড় জলাশয়ে কেউ তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক রংপুর ডুবুরি দলকে খবর দিতে হয়। ওই ডুবুরি দলের সদস্যরা ঠাকুরগাঁও জেলাতে পৌঁছাতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লেগে যায়, যা উদ্ধারকাজ ব্যাহত করে।

নদী ও জলাশয়ের গভীরতার কথা উল্লেখ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান জানান, ঠাকুরগাঁওয়ের ৩৬টি নদের মোট দৈর্ঘ্য ৬৯২ দশমিক ৪ কিলোমিটার। বর্ষাকালে বড় নদীগুলোতে পানির গভীরতা বেড়ে ২৫ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত পৌঁছায়, এমনকি শুষ্ক মৌসুমেও অনেক নদীতে ৫ ফুট পর্যন্ত পানিপ্রবাহ থাকে। নদীকেন্দ্রিক গৃহস্থালি কাজ, পশুপাখি গোসল করানো ও কৃষিকাজের কারণে প্রতিদিন হাজারো মানুষ নদী ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন, যা বর্ষাকালে জীবনহানির ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হয়ে উঠছে। একইভাবে জেলার অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের তথ্য দিয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার সরকার জানান, ঠাকুরগাঁওয়ের পাঁচটি উপজেলায় বাণিজ্যিক ও পারিবারিক মিলিয়ে প্রায় ২১ হাজার পুকুর ও দীঘি রয়েছে। বর্ষার মৌসুমে এগুলোর বেশিরভাগই কানায় কানায় পূর্ণ থাকে।

অনেক ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত গভীর পুকুর খনন এবং সঠিক তদারকির অভাবে শিশুসহ সাধারণ মানুষ হরহামেশাই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। পুলিশ নথি ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে পানিতে ডুবে একের পর এক মর্মান্তিক প্রাণহানির চিত্র পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার দুপুরে পীরগঞ্জ উপজেলার উত্তর মালঞ্চা এলাকার আমবাড়ী ঘাটে টাঙ্গন নদী পার হওয়ার সময় পানিতে তলিয়ে যান মহাদেব চন্দ্র রায় (২৩) নামের এক যুবক। বন্ধুদের সঙ্গে সাঁতার কেটে নদী পার হতে গিয়ে মাঝপথ থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করতেই তিনি পানিতে ডুবে যান। পরে পীরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা গিয়ে বিকেলে নদী থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করেন। এর আগের দিন ২০ জুলাই সোমবার সন্ধ্যায় রানীশংকৈল উপজেলার টেকিয়া মহেষপুর গ্রামে বাড়ির মাত্র ৪৫০ গজ দূরে রবিউল ইসলাম নামের এক প্রতিবেশীর পুকুরে পড়ে মারা যায় ৬ বছর বয়সী শিশু ফয়সাল আলী। বিকেলে খেলতে বেরিয়ে আর বাড়ি না ফেরায় স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন এবং রাতে পুকুরে তাঁর নিথর দেহ ভাসতে দেখা যায়। এর আগে গত ১৯ জুলাই ভূল্লী থানার সারডুবি গ্রামে পাথররাজ নদী পার হয়ে জমিতে কাজ করতে গিয়ে নিখোঁজ হন ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ শ্রী মোহন্ত রায়।

পরদিন রংপুর থেকে আসা ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল নদী থেকে তাঁর অর্ধগলিত মৃতদেহ উদ্ধার করে। একইভাবে গত ১৮ জুলাই বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার নাগর নদীতে পালিত গরুকে গোসল করাতে গিয়ে নিখোঁজ হয় ১৪ বছরের কিশোরী সুমি আক্তার। পরে নদী থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জিআরও শাখা ও সংশ্লিষ্ট থানা সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২ জানুয়ারি থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন থানায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় মোট ৪৭টি অপমৃত্যু মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জিআরও ফরিদুজ্জামান জানান, বর্ষার এই মৌসুমে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকা থেকে পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর আসছে। নিহতদের মধ্যে শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও পুরুষ রয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ছয় শতাধিক কিলোমিটার নদীপথ থাকা সত্ত্বেও জেলায় উদ্ধারকারী ডুবুরি দল না থাকাকে চরম অবহেলা বলে অভিহিত করেছেন সামাজিক সংগঠন ঠাকুরগাঁও শাখার সভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, উদ্ধারকারী ডুবুরি দল না থাকায় পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর বিভাগীয় শহর রংপুর থেকে ডুবুরি আনতেই মূল্যবান সময় পার হয়ে যায়। ফলে নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয় না।

সার্বিক পরিস্থিতি বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সরদার মোস্তফা শাহীন জানান, নদী ও খালের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যাতে সাধারণ মানুষ সতর্ক থাকে, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে জেলায় জরুরি ভিত্তিতে ফায়ার সার্ভিসে স্থায়ী ডুবুরি পদ সৃষ্টি ও পদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দাপ্তরিক চিঠি পাঠানো হবে।

সর্বশেষ
প্রকাশক ও সম্পাদক - সিকদার সাদেকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক- জাহিদুল হাসান জাহিদ
কার্যালয়ঃ ৪ দারুসসালাম রোড, মিরপুর, ঢাকা।
aazkaalbangla@gmail.com
মোবাইলঃ +8801842280000
আজকাল বাংলা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2021-2025 AjkalBangla.Com All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram