

এস এম আওলাদ হোসেন, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের বুক খালি করেনি, বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আইফোন চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে একজন কিশোর শিক্ষার্থীকে মারধর, নির্যাতন এবং পরবর্তীতে মৃত্যুর ঘটনায় গোটা সমাজ স্তম্ভিত।
অভিযোগ অনুযায়ী, মেহেদীর বিরুদ্ধে একটি মোবাইল ফোন চুরির অপবাদ দেওয়া হয়। অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা—কোনো অবস্থাতেই একজন শিক্ষার্থীকে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়। অথচ উদ্বেগজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যে অনেকেই নিজেদের আইন ও আদালতের ঊর্ধ্বে মনে করতে শুরু করেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বলা হয় মানুষ গড়ার কারখানা। সেখানে একজন শিক্ষার্থী যদি সহপাঠী বা সিনিয়রদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারায়, তাহলে সেটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরির যে দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, সেখানে এমন ঘটনা গভীর উদ্বেগের কারণ।
বিশ্বব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র্যাগিং, বুলিং এবং শারীরিক নির্যাতনের কারণে অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনার নজির রয়েছে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার পর কিছুদিন আলোচনা হলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়। ফলে একই ধরনের ঘটনা বারবার ফিরে আসে।
মেহেদীর মৃত্যুর ঘটনায় যদি সত্যিই নির্যাতনের মাধ্যমে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তা কেবল হত্যা নয়, মানবিকতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অভিযোগ রয়েছে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করা হয়েছে। যদি এমনটি প্রমাণিত হয়, তবে তা অপরাধকে আড়াল করার আরও গুরুতর প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হবে।
এই ঘটনায় প্রশাসনের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা। প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একইসঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবাসিক ছাত্রাবাস ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের তদারকি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
একজন মেহেদীর মৃত্যু যেন আরেকজন মেহেদীর জন্য সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কখনো ভয়, নির্যাতন বা ক্ষমতার প্রদর্শনের স্থান হতে পারে না। এটি হতে হবে নিরাপত্তা, মানবিকতা ও জ্ঞানচর্চার আশ্রয়স্থল। সমাজের প্রত্যাশা—মেহেদীর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হবে এবং দোষীরা শাস্তি পাবে। কারণ বিচার প্রতিষ্ঠিত হলেই কেবল ভবিষ্যতে এমন নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব।
