ঢাকা
২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ১:১০
প্রকাশিত : জুন ২০, ২০২৬
আপডেট: জুন ২০, ২০২৬
প্রকাশিত : জুন ২০, ২০২৬

সুন্দরবনের তলদেশে সুপেয় পানির বিশাল ভাণ্ডার: উপকূলীয় সংকটে নতুন আশার সঞ্চার

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া:

‎জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততার চরম সংকটে থাকা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির দুটি বিশাল স্তরের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা, যা দীর্ঘমেয়াদী পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন কৌশলগত সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

‎জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদগুলোতে সুপেয় পানির সংকট যখন চরম আকার ধারণ করেছে, ঠিক তখনই এক যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আশার আলো দেখা দিয়েছে। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর লবণাক্ততায় আক্রান্ত হওয়ায় লাখো মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপদ পানির তীব্র অভাব ভোগ করছেন। সম্প্রতি নেচার কমিউনিকেশনসে প্রকাশিত এক যৌথ গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সুন্দরবনের তলদেশে এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রায় ৮০ কিলোমিটার বিস্তৃত দুটি বিশাল সুপেয় পানির ভান্ডারের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউ মেক্সিকো ইনস্টিটিউট অব মাইনিং অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকদের সমন্বয়ে পরিচালিত এই গবেষণায় খুলনা থেকে সুন্দরবনের পশুর নদী অববাহিকা পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার এলাকায় ২৫টি পয়েন্টে পরীক্ষা চালানো হয়েছে। বরফ যুগের সময় গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মিঠাপানি এবং বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে বালুময় স্তরে জমা হয়েছিল, যা মাটির নিচের শক্ত কাদার স্তরের সুরক্ষায় হাজার বছর ধরে সংরক্ষিত রয়েছে। এই আবিষ্কার উপকূলীয় পানি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সংকট নিরসনে একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রদান করেছে।

‎উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এবং ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, অগভীর নলকূপের পানি পানযোগ্য নয় এবং পুকুরের পানি দূষিত। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততার মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছালে সুপেয় পানির সন্ধানে নারীদের কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়, যা তাদের জীবনযাত্রার মান ও স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম স্তরের পানি মাটির প্রায় ৮০০ মিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত, যা ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিদ্যমান। দ্বিতীয় স্তরটি সুন্দরবনের মধ্যভাগের নিচে ২৫ থেকে ২৫০ মিটার গভীরতায় অবস্থিত এবং এটিও প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ। যদিও দ্বিতীয় স্তরে লবণাক্ততার উপস্থিতি কিছুটা বেশি থাকতে পারে, তবুও এই প্রাকৃতিক ভাণ্ডার স্থানীয়দের পানির চাহিদা মেটাতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তবে এই পানি সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এবং লবণাক্ত পানির সাথে মিশে যাওয়ার যে ঝুঁকি রয়েছে, তা ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে। ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য নষ্ট হলে উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান আরও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

‎গবেষক দলের প্রধান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা স্পষ্ট করেছেন যে, এই পানি ১০ থেকে ২৫ হাজার বছর আগের সংরক্ষিত সম্পদ, যা দ্রুত নবায়নযোগ্য নয়। তাই এই সম্পদকে সাধারণ সেচ বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। বরং এটিকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ‘কৌশলগত পানির রিজার্ভ’ হিসেবে চিহ্নিত করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ব্যবহার করার সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এই পানির স্তর সুরক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম উপকূলের মতো অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও দ্রুত জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা। যত্রতত্র গভীর নলকূপ স্থাপনের ফলে ভূগর্ভস্থ চাপের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পাশের লবণাক্ত পানি মিঠাপানির স্তরে ঢুকে পড়ার যে ঝুঁকি রয়েছে, তা মোকাবিলায় কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি ও তদারকির প্রয়োজন রয়েছে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমেই কেবল এই প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত সম্পদকে উপকূলীয় মানুষের জীবন রক্ষায় কার্যকর করা সম্ভব।

‎এই আবিষ্কারের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের পানি সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের একটি পথ উন্মোচিত হলেও, এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যদি অপরিকল্পিত উত্তোলনের ফলে এই স্তরগুলো লবণাক্ত হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে উপকূলীয় মানুষের জন্য আর কোনো বিকল্প উৎস অবশিষ্ট থাকবে না। তাই পরিবেশবাদী ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগে এই পানিকে কেবল জরুরি ও জীবনধারণের জন্য সংরক্ষিত রাখা বাঞ্ছনীয়। উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই ভূগর্ভস্থ পানির ভাণ্ডার আগামী দিনে একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে, যদি এর ব্যবহার ও সংরক্ষণ যথাযথ বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড মেনে পরিচালিত হয়। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এই পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এখন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

সর্বশেষ
প্রকাশক ও সম্পাদক - সিকদার সাদেকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক- জাহিদুল হাসান জাহিদ
কার্যালয়ঃ ৪ দারুসসালাম রোড, মিরপুর, ঢাকা।
aazkaalbangla@gmail.com
মোবাইলঃ +8801842280000
আজকাল বাংলা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2021-2025 AjkalBangla.Com All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram