

আজকাল বাংলা ডেস্ক:
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নির্বিচারে আটক করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তা অব্যাহত আছে। নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক মানবাধিকার প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অধ্যায়ে এ কথা বলা হয়েছে। গতকাল বুধবার এইচআরডব্লিউর ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। আজ বৃহস্পতিবার এশিয়া অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাঙ্ককে এইচআরডব্লিউর সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে বা প্রতিশ্রুত মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে হিমশিম খেয়েছে। এইচআরডব্লিউ বলেছে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলের বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিচিত ব্যাপক গুমসহ ভয় ও দমনের যে পরিবেশ ছিল, তার কিছু অংশ শেষ হয়েছে বলে মনে হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকার হাজার হাজার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বিচারে আটক করেছে এবং মে মাসে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে। গত ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ২০২৪ সালের বিক্ষোভ দমনের চেষ্টার সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।
’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রাজনৈতিক দল এবং অন্যান্য অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ গণপিটুনি বা মব ভায়োলেন্স। এর মধ্যে ছিল উগ্রপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো, যারা নারী অধিকার ও লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডারদের প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে গণপিটুনিতে বা মব সহিংসতায় অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছে।’ ‘অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়বদ্ধতা’ প্রসঙ্গে এইচআরডব্লিউ বলেছে, ‘গত বছর ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা আন্দোলনের সময় পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল।
ফলে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়। তবে অভিযুক্ত অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে সরকার সীমিত অগ্রগতি দেখিয়েছে। গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ পুলিশের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, ২০২৪ সালের বিক্ষোভ দমনে ভূমিকার জন্য মাত্র ৬০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ এইচআরডব্লিউ বলেছে, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ শাসনামলে সংঘটিত সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর বিচার বাংলাদেশের আইসিটিতে করার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি একটি অভ্যন্তরীণ আদালত, যা এর আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল।
গত নভেম্বরে অনুপস্থিত থাকা অবস্থায় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে বিচারের পর মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করা হয়। হেফাজতে থাকা একজন সাবেক পুলিশপ্রধান প্রসিকিউশনের পক্ষে সাক্ষ্য দেন এবং তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ট্রাইব্যুনালটি সুষ্ঠু বিচারের মানদণ্ড লঙ্ঘনের অভিযোগে জর্জরিত ছিল। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার আদালত গঠনকারী আইন সংশোধন করে কিছু উন্নতি করেছে। তবু এতে গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা বা ‘ডিউ প্রসেস প্রোটেকশন’-এর অভাব রয়েছে এবং এতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান অন্তর্ভুক্ত আছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী। অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনালকে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বিচার ও ভেঙে দেওয়ার ব্যাপক ক্ষমতাও দিয়েছে।”
এইচআরডব্লিউ বলেছে, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের আমলে সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তে কমিশন গঠন করে। কমিশন ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত এক হাজার ৮৫০টিরও বেশি অভিযোগ পেয়েছে। কমিশনের সদস্যরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছেন, তাঁরা উল্লেখযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা প্রমাণ ধ্বংস করেছেন, সহযোগিতা সীমিত করেছেন এবং অভিযুক্তদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রচেষ্টায় বাধা দিচ্ছেন। গত অক্টোবরে কর্তৃপক্ষ গুমের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে।’
‘স্থবির সংস্কার’ শীর্ষক অনুচ্ছেদে এইচআরডব্লিউ বলেছে, ‘শেখ হাসিনা তাঁর ১৫ বছরের শাসনামলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগ, নির্বাচনী ব্যবস্থা, পুলিশ, নারী অধিকার, শ্রম অধিকার, সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের সুপারিশ করার জন্য বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করে। এরপর সুপারিশকৃত সংস্কারের প্যাকেজ চূড়ান্ত করার জন্য ইউনূসের সভাপতিত্বে কনসেনসাস বা ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। তবে রাজনৈতিক অংশীজনদের মধ্যে ঐকমত্যের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে খুব কম সংস্কারই গৃহীত বা বাস্তবায়িত হয়েছে।’
‘নির্বিচারে আটক, গণগ্রেপ্তার ও হেফাজতে মৃত্যু’ শীর্ষক অনুচ্ছেদে এইচআরডব্লিউ বলেছে, ‘আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নির্বিচারে আটক করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অব্যাহত আছে। এর মধ্যে ফৌজদারি অভিযোগে শত শত অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার চর্চাও ছিল। আওয়ামী লীগের শত শত নেতা, সদস্য ও সমর্থক হত্যা মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে হেফাজতে রয়েছেন।
তাঁদের বিচার ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে এবং নিয়মিত জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে অভিনেতা, আইনজীবী, গায়ক ও রাজনৈতিক কর্মী রয়েছেন।’ এইচআরডব্লিউ জানায়, ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযানের মাধ্যমে আরো কিছু মামলা দায়ের করা হয়। এর ফলে অন্তত আট হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কঠোর বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আরো অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকতে পারে, যা আগে ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত হতো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গত বছরের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জ শহরে নিরাপত্তা বাহিনী এবং বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হয়। এটি ২০২৪ সালের আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের দ্বারা গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির সমাবেশের পর ঘটে। পুলিশ পরে শত শত কথিত আওয়ামী লীগ সমর্থককে নির্বিচারে আটক করে এবং আট হাজার ৪০০ জনেরও বেশি (যাদের বেশির ভাগই অজ্ঞাতপরিচয়) মানুষের বিরুদ্ধে ১০টি হত্যা মামলা দায়ের করে।’
মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর গত অক্টোবরের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৪ জন নির্যাতনের কারণে মারা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় আট হাজার মানুষ আহতএবং ৮১ জন নিহত হয়েছে।’
এইচআরডব্লিউ বলেছে, ‘২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও অন্তর্বর্তী সরকারে তাদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব ছিল না। গত এপ্রিলে নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষায় গঠিত কমিশন বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, নারীদের সমানভাবে অভিভাবকত্ব প্রদান, উত্তরাধিকার আইন সংস্কার এবং সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির সুপারিশ করে। তার কিছুদিন পরেই হেফাজতে ইসলামের প্রায় ২০ হাজার সমর্থক রাজধানী ঢাকায় অন্যান্য ইস্যুর সঙ্গে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর প্রতিবাদে সমাবেশ করে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্রের চাপে রোহিঙ্গারা যৌন সহিংসতা, অপহরণ, জোরপূর্বক নিয়োগ, চাঁদাবাজিসহ নানা রকমের চাপ ও সহিংসতার সম্মুখীন হয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী সুরক্ষা, আইনি সহায়তা ও চিকিৎসাসেবার প্রায় সম্পূর্ণ অভাবের কথা জানিয়েছে। বৈদেশিক সাহায্য হ্রাস এবং নতুন আগমনের ফলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও প্রাক-শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে এবং খাদ্য ও রান্নার গ্যাসের বরাদ্দ কমে গেছে। মানবিক কর্মীরা রোগের প্রাদুর্ভাব, শিশুদের অপুষ্টির পাশাপাশি মানবপাচার, অনিয়মিত অভিবাসন ও গ্যাং সহিংসতার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।’
এইচআরডব্লিউ বলেছে, ‘গত বছরের ২৬ ও ২৭ জুলাই রংপুর জেলায় একদল জনতা হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের অন্তত ১৪টি বাড়ি ভাঙচুর করে। বছরের বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অব্যাহত মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর পাওয়া গেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করার সময় সংঘটিত অপরাধের মধ্যে ধর্ষণও অন্তর্ভুক্ত ছিল।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান উৎস ছিল পোশাক খাত। ওই খাতের বেশির ভাগ কর্মী নারী। গত সেপ্টেম্বরে মালিক ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে কিছু শ্রমিকের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়তে পারে। নতুন আইন গৃহীত হলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের আনুমানিক ৯০ শতাংশ শ্রমিক সুরক্ষাহীন থেকে যাবে। গত জানুয়ারিতে চুরির অভিযোগে পোশাক কারখানার এক শ্রমিককে ঊর্ধ্বতন কর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।’
‘মত প্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা’ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “গত বছর মে-তে সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি সংশোধনী ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের ওপর ‘সাময়িক’ নিষেধাজ্ঞা জারি করে।” প্রতিবেদনে বলা হয়, “২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর অসংখ্য হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা প্রায়ই রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং সহিংস জনতার মতো অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষগুলো ঘটিয়েছে। পুলিশ ও আদালত জনসাধারণের পক্ষ থেকে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ দেওয়ার অভিযোগে লেখকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনে মামলা পরিচালনা করেছে।”
এইচআরডব্লিউ বলেছে, “বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) মত প্রকাশের স্বাধীনতায় অননুমোদিত বিধি-নিষেধ আরোপের সুযোগ দেয় এবং সেগুলোর মধ্যে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ অন্যতম। এটি রাজনৈতিক সমালোচকদের অপরাধী হিসেবে গণ্য এবং কারাগারে পাঠানোর ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। গত বছর মার্চে অন্তর্বর্তী সরকার বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অপব্যবহৃত ৯টি ধারা বাতিলের জন্য সিএসএ সংশোধন করে। তবে সংশোধনীতে এমন কিছু বিধান রয়ে গেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড পুরোপুরি মেনে চলে না।”
