

তৌসিফ রেজা (সৈয়দপুর) নীলফামারী:
বাংলাদেশ ষড় ঋতুর দেশ। প্রতিটি ঋতুরই রয়েছে তার আলাদা আলাদা রূপ ও বৈশিষ্ট্য। ঠিক একইভাবে শীতকালেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বাংলা বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে পৌষ ও মাঘ এই দুই মাস শীতকাল। শীতকালের হিমেল হাওয়ায় তনুমন হারিয়ে যায় এক অন্য জগতে। সকালের শিশিরভেজা ঘাস, খেজুরের রস, বাহারি পিঠা সব মিলিয়ে মনের মধ্যে এক অন্য রকম আনন্দ ও উচ্ছ্বাস কাজ করে।
কিন্তু একই শীত অন্য দিকে নিয়ে আসে অসহনীয় বিপর্যয়। ছিন্নমূল ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এই শীতের ভূমিকা প্রতিনায়কের ন্যায়। শহরের ফুটপাত, গ্রামের খড়কুটো ও চরাঞ্চলের জন্য শীতকাল এক অভিশাপ। শীত যেমন শিশুদের কাঁপিয়ে তোলে, ঠিক একইভাবে বৃদ্ধদের শ্বাস চেপে ধরে। এই দুই শ্রেণির মানুষ শীতকালে মহা বিড়ম্বনার মুখোমুখি হন।
ডিসেম্বর এলেই কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে মাঠ ও রাস্তা-ঘাট। সকাল আটটাতেও সূর্যের দেখা মেলে না। দরিদ্র মানুষের জন্য এই শীত শুধু ঋতুই নয়, বরং অনিশ্চয়তার আরেক নাম। যাদের শরীরে গরম কাপড় নেই, মাথার ওপর নেই শক্ত ছাদ তাদের কাছে প্রতিটি রাত যেন মৃত্যুর কাছাকাছি।
শীতকালে ঠান্ডাজনিত রোগের এক মচ্ছবের দেখা মেলে। ২০২৩–২৪ বর্ষে শীতজনিত রোগে ২৮১ জন মৃত্যুবরণ করেন। তাছাড়া IEDCR-এর গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে শীতকালে ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ ১.৭৪% থেকে ২%। এছাড়া গত বছরের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে শীতজনিত অসুস্থতার কারণে সারাদেশে আড়াই লক্ষাধিক মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউটে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। ২০২৪ সালের ঢাকার শিশু হাসপাতালে জানুয়ারির প্রথম ১১ দিনে ৭৪ জন শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিল।
প্রচণ্ড শীতে অনেক মানুষের কাজ কমে যায়। দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, ভ্যানচালক, নির্মাণশ্রমিকরা পর্যাপ্ত কাজ না পাওয়ায় তাদের আয় কমে যায়। ফলে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণেও হিমশিম খেতে হয়। একদিকে নির্মম শীত, অন্যদিকে ক্ষুধা দুটো একসাথে মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটায়।
প্রতি বছর নানা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ছাত্রসমাজ, বোদ্ধা মহল ও বিত্তবান মানুষেরা শীতবস্ত্র বিতরণে এগিয়ে আসেন। কিছু উষ্ণ কম্বল, সোয়েটার আর মাফলার সাময়িক স্বস্তি দিলেও এটি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কিন্তু এই কম্বলগুলোর অধিকাংশই হয় নিম্নমানের, যা শুধু নামমাত্র কম্বল। এসব কম্বল থেকে তেমন একটা উপকার হয় না সুবিধাভোগীদের। তারপরেও একটি বাংলা প্রবাদ আছে “নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।” নিরাশার মাঝে সামান্য আশার আলো থাকা ভালো।
গত বছর শেষে বা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সারা দেশে শীতার্তদের মধ্যে কম্বল বিতরণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৬ লাখ ৭৯ হাজার পিস কম্বল ও শীতবস্ত্র কেনার লক্ষ্যে ৩৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সুধী মহলে এই বরাদ্দকৃত কম্বলের পরিমাণ, বণ্টন ও গুণগত মান নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। এছাড়া বিভিন্ন বড় বড় সংস্থা স্থানীয় পর্যায়ে কম্বল বিতরণ করেছে।
এই শীতবস্ত্র বিতরণের পরও একটি সমস্যা থেকে যায়, যা হলো শীতবস্ত্র বিতরণ অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব, পরিচিত–অপরিচিতের ভিত্তিতে বণ্টন ও শহরকেন্দ্রিকতার এই তিন সমস্যায় জর্জরিত থাকে। অথচ প্রকৃত দরিদ্র মানুষ বাস করে চরাঞ্চল, পাহাড়ি জনপদ ও গ্রামে। অনেক সময় তারাই বঞ্চিত হয়। আবার অনেকে সুষম বণ্টনের অভাবে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করার পরও শীতবস্ত্র পান না, যার ফলে তারা ব্যথিত ও হতাশাগ্রস্ত হয়।
মোদ্দাকথা, শীত ঋতু পরিবর্তনের পরম্পরায় প্রতিবছরই আসে। এটি নতুন বা অপ্রত্যাশিত কোনো দুর্যোগ নয়। প্রতি বছর শীত এলে কিছু মানুষ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও পত্র-পত্রিকায় গরিব মানুষের দুর্ভোগের কথা নতুন করে আবিষ্কার করে। এর মানে দাঁড়ায় রাষ্ট্রীয় কোনো প্রস্তুতি এখনো পরিকল্পিত নয়; এটি সরকারিভাবে প্রতিক্রিয়াশীল উদ্যোগ।
রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু শীত এলেই এই মৌলিক অধিকারগুলো দরিদ্র মানুষের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। যদি শীত আগমনের পূর্বেই সরকারি উদ্যোগে দরিদ্র মানুষগুলোর তালিকা হালনাগাদ করা হয়, অস্থায়ী শীতনিরোধক সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়, চরাঞ্চল ও পাহাড়ি জনপদের জন্য আগাম কম্বল মজুদ করা হয় এবং ফুটপাতবাসী ও ভাসমান মানুষগুলোর জন্য বিশেষ উষ্ণ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয় তবে প্রকৃত অর্থে এই দরিদ্র মানুষগুলোর কষ্ট লাঘব করা সম্ভব।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, শীত তীব্র হওয়ার পর হঠাৎ তড়িঘড়ি করে কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু করা হয়। যেখানে সুষম বণ্টনের অভাব, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বঞ্চিত হওয়া এবং তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল এই তিনটি সমস্যাই প্রকট হয়। এছাড়াও ঠান্ডাজনিত রোগব্যাধি মোকাবিলার জন্য গ্রামীণ ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ, চিকিৎসক এবং চর ও দুর্গম এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোর সুব্যবস্থা করা হলে মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কমানো সম্ভব।
শীতবস্ত্র বিতরণ কোনো দয়া নয়, দায়মুক্তিও নয় এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নাগরিক শুধু ভোট দেওয়ার জন্য নয়, বেঁচে থাকা ও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার নিয়েই রাষ্ট্রের অংশ হয়। শীতের দুর্ভোগ প্রতি বছর প্রমাণ করে আমাদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এখনো যথেষ্ট পরিকল্পিত ও টেকসই হয়নি। কাঠামোগত শৃঙ্খলা ও মানবিক ব্যবস্থাপনার অভাবে যদি গরিবের শীতের কষ্ট প্রতি বছর একই রকম থাকে, তাহলে সমস্যা প্রকৃতির নয় সমস্যা আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার।
