

আবু তাহের, স্টাফ রিপোর্টার :
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে পারিবারিক কলহের জেরে শরীরে পেট্রোল ঢেলে নিজে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার পর পুরো শরীর ঝলসে যাওয়া যুবক রায়হান চিকিৎসাধীন মারা গেছেন।
বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ৮টার দিকে রায়হানের বন্ধু খাজা মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, রাত ৩টার দিকে ঢাকার একটি হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার।
এর আগে, গত মঙ্গলবার (২৮) দুপুরের দিকে উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের নতুনবাজার এলাকার বাড়িতে নিজের শরীরে নিজে পেট্রল ঢেলে নিজেই আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন ওই যুবক। ওই দিন সন্ধ্যার পরে এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরতে থাকে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, শরীরের অধিকাংশ জায়গা পুড়ে হাত ও পায়ের ত্বকের চামড়া ঝুলে পড়ছে ওই যুবকের। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছিল তখন। রায়হান মিয়া উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের নতুনবাজার এলাকার চান মিয়ার ছেলে। প্রথমে প্রেম এবং পরে বাবা-মার সম্মতিতে প্রায় ৮-৯ বছর আগে তিনি বিয়ে করেন একই ইউনিয়নের বড় দিঘিরপার গ্রামে।
দাম্পত্য জীবনে দুটি সন্তানও রয়েছে তাদের। কিন্তু এরই মধ্যে রায়হান আসক্ত হয়ে পড়েন অনলাইন জুয়ার পাশাপাশি পরনারীর প্রতি। মাস দুয়েক আগে স্থানীয় এক নারীর সাথে অবৈধ মেলামেশা করতে গিয়ে ধরাও পড়েন তিনি। পরে শাশুড়ির চাপে স্ত্রী আদুরী নিজের গহনা বিক্রির টাকায় ঘটনাস্থল থেকে ছাড়িয়ে আনেন তাকে। এমন ঘটনার সপ্তাহ না পেরুতেই অপর আরেক নারীকে বিয়ে করবেন বলে স্ত্রীকে চাপ দেন রায়হান।
উপরন্তু, রাত গভীরে বাড়ি ফেরায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না তাদের। মাস খানেক আহে এ নিয়ে স্ত্রীকে মারপিট ও মাথার চুল ধরে টানাহ্যাঁচড়া এবং বৈদ্যদিক (বিদ্যুৎ) শক দেওয়ার চেষ্টা করে রায়হান। এর দুই-তিন দিন পরে আবার মারপিট করলে শ্বশুরের কথা মতো দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান আদুরী। এমন নির্যাতনের ঘটনা শ্বশুর-শাশুড়ির সামনে ঘটলেও কোনো পদক্ষেপ নেননি তারা- এমন অভিযোগ রায়হানের শাশুড়ির। এদিকে, ঘটনার দিন সকালে এক ভাগ্নেকে সাথে নিয়ে ছেলে রায়হানের বউকে আনতে গেলে পুত্রবধূ ( শ্বশুড়কে জানান, বাড়িতে যেতে রাজি আছেন. তবে ছেলের মারপিট থেকে রক্ষা করতে হবে তাকে।
পুত্রবধূ এমন শর্ত দেওয়ায় বাবা চান মিয়ার ভাগ্নে ফোন দেন রায়হানকে। রায়হানের শাশুড়ির ভাষ্য, তার (রায়হানের) অনুমতি ছাড়া কেন বউকে আনতে গেছেন তারা তা জানতে চান রায়হান। ছেলের মুখে এমন কথা শুনে পুত্রবধূর নিরাপত্তা দিতে পারবেন না বলে খাবার রেডি থাকলেও তা না খেয়ে বউকে ছেড়ে চলে যান চান মিয়া ও তার ভাগ্নে।
পরে রায়হান শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন বলে খবর পান শ্বশুরবাড়ির লোকজন- আর এসব কথা বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন রায়হানের শাশুড়ি।
স্থানীয়রা জানান, নিজের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুকুরে লাফ দিয়েছিলেন রায়হান। প্রবীণ এক ব্যক্তি বলেন, মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে রায়হানের শ্বশুর বাড়িতে এসেছিলেন তার বাবা চান মিয়া (চান্দু) ও তার ভাগ্নে। কথা ছিল খাওয়া-দাওয়া শেষে বউ নিয়ে ফিরবেন তারা। মাঝ সময়ে রায়হানের সাথে ফোনে কথা বলেন চান মিয়ার ভাগ্নে। পরে তার এবং রায়হানের বাবার সাথে অসৌজন্যমূলক কথা বললে বউ ছাড়াই চলে যান তারা।
এ বিষয়ে জানতে যাওয়া হয়েছিল রায়হানের বাড়িতে। দেখা হয় রায়হানের দুলাভাই সবুজ মিয়ার সাথে। গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে কথা বলতে চাইছিলেন না তিনি। এমন সময় তার ধান-চালের আড়তে প্রবেশ করেন রায়হানের ডিগ্রি প্রথম বর্ষে পড়ুয়া বোন। গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে চটে যান তিনি। বলেন, 'ঘটনার সময় তিনি উপস্থিত থাকলে সেখানে উপস্থিত থাকা এক গণমাধ্যমকর্মী এবং অন্যদের ভিডিও চিত্র ধারণ করে তা ফেসবুকে পোস্ট করায় ইচ্ছেমতো তাদের লাঠি দিয়ে পেটাতেন তিনি।
' এ বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বার মো. আব্দুল মোন্নাফ মিয়ার সাথে মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেও ফোন রিসিভ করেননি তিনি। পরে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দুই-তিন ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করার পরেও দেখা পাওয়া যায়নি তার।
বিষয়টি জানতে চাইলে ধোপাডাঙা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, এক বাপের এক বেটা হলে যা হয় আর কী। অনলাইন জুয়া এবং অন্য কিছুর প্রতি আসক্ত কি না জানতে চাইলে- প্রথমে বলা শুরু করলেও পরে তা এড়িয়ে যান তিনি। বলেন, গৃহস্থ মানুষের এক বেটা বাহাদুর হয়।
সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আ. হাকিম আজাদ বলেন, সে নিজে নিজেই তো ঘটনাটি ঘটিয়েছে। এরপর আর কে অভিযোগ দেবে বলুন।
