

বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর বাউফলে সাংবাদিক পরিচয়ে একটি পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে চার ব্যক্তির বিরুদ্ধে। পরে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার হস্তক্ষেপে ওই টাকা ফেরত দেওয়া হয় বলে দাবি করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। টাকা ফেরতের সময় অভিযুক্তদের একজনকে পৌর শহরের সৌদিয়া মার্কেট এলাকায় আটক করেন পরিবারের সদস্যরা। এ সময় ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করা হয়। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
রবিবার (২৬ জুলাই) রাতে সৌদিয়া মার্কেট এলাকায় অভিযুক্তদের একজনকে আটকের ঘটনা ঘটে। এর আগে একই দিন বিকেলে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ করা হয়। জানা গেছে, উপজেলার দাসপাড়া ইউনিয়নের শাওন মন্ডল (৩০) প্রায় তিন বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের পর আদালতের মাধ্যমে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী এক নারীকে বিয়ে করেন। দীর্ঘদিন বিষয়টি দুই পরিবার থেকেই গোপন রাখা হয়।
পরে উভয় পরিবার বিয়ের বিষয়টি জানতে পারে। মেয়ের পরিবার তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করলেও ছেলের পরিবার বিয়ে মেনে নেয়। এরপর থেকে দম্পতি দাসপাড়া ইউপি কার্যালয় সংলগ্ন মন্ডল বাড়িতে বসবাস করে আসছিলেন। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, রবিবার বিকেলে সাংবাদিক পরিচয়ে চার ব্যক্তি তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে শাওন মন্ডলের মা ও স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তারা দাবি করেন, শাওন ভিন্ন ধর্মের এক নারীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেছেন, সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য করেছেন এবং ওই নারীকে জোরপূর্বক আটকে রেখেছেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, সে সময় বাড়িতে শাওনের এক চাচা ছাড়া অন্য কোনো পুরুষ সদস্য ছিলেন না। শাওনের স্ত্রী আদৌ কোনো অভিযোগ করেছেন কি না জানতে চাইলে অভিযুক্তরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং ঘরে আগুন দেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়। এ সময় পাশের বাড়ির এক নারী তার সেনাবাহিনীতে কর্মরত স্বামীর সঙ্গে অভিযুক্তদের মোবাইল ফোনে কথা বলানোর চেষ্টা করলে তারা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই নারীর মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে গ্যালারি তল্লাশি করা হয় এবং ফোন ফেরত নিতে গেলে তাকে ধাক্কা দেওয়া হয়।
এদিকে, অভিযুক্ত চারজনের একজন শাওনের চাচা ভবরঞ্জন মন্ডলকে আলাদা ডেকে নিয়ে যান। সেখানে তার কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে শাওন ও তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতার করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা হবে—এমন ভয়ভীতি দেখানো হয়। একপর্যায়ে ২০ হাজার টাকা তাৎক্ষণিক এবং পরদিন আরও ১০ হাজার টাকা দেওয়ার শর্তে তারা সেখান থেকে চলে যান। শাওন মন্ডলের চাচা ভবরঞ্জন মন্ডল বলেন, ভয়ে বাধ্য হয়ে পাশের একটি দোকান থেকে ২০ হাজার টাকা ধার এনে তাদেরকে দেই। তিনি জানান, সন্ধ্যার পর বাড়ির অন্য সদস্যরা ফিরে এসে বিষয়টি শুনে সন্দেহ করেন, তারা প্রকৃত সাংবাদিক নন। পরে পরিচিত এক বিএনপি নেতাকে বিষয়টি জানানো হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা ছবি দেখে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়। ওই নেতার উদ্যোগে অভিযুক্তরা টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন। ঘটনার পর থেকে পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কে রয়েছেন। শাওন মন্ডল স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলেও জানান স্বজনরা। তারা এ ঘটনায় আইনগত নিরাপত্তা দাবি করেছেন।
এদিকে, ভাইরাল ভিডিওতে আটক ব্যক্তির নাম এনামুল হক এনা বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে তাকে এলাকায় খুব একটা দেখা যেত না। পরে এলাকায় এসে বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তার বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদককে মারধরের চেষ্টা, সরকারি হাসপাতালের রোগীদের জন্য বরাদ্দ বিনামূল্যের ওষুধ নিজের বাসার জন্য সংগ্রহের চেষ্টা, নিজেকে সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে সাংবাদিকদের হেনস্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির চরিত্রহনন, এক নারী শিক্ষককে বিদ্যালয়ে গিয়ে হেনস্তা এবং চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রচারের অভিযোগ রয়েছে। অপরদিকে, পূর্বে গুজব ছড়ানোর জন্য তার নামে থানায় অভিযোগ হয়েছিলো এবং মুচলেকার মাধ্যমে একটি ঘটনা মীমাংসাও হয়েছে।
এছাড়াও তিনি "প্রেস রিলিজ অব ড. মাসুদ" নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ পরিচালনা করেন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদের বিভিন্ন কর্মসূচির সংবাদ বিজ্ঞপ্তি সেখানে প্রচার করেন। তিনি নিজেকে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও ''এদিন'' পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেন। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানের আগে ঢাকায় সাংবাদিকতা করতেন বলেও দাবি করেন। অভিযোগ অস্বীকার করে এনামুল হক এনা এক সাংবাদিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, "টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। কীভাবে টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে, সেটিও আমি জানি না।" তিনি দাবি করেন, মুসলিম এক নারীকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করার অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তারা সেখানে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে আরও তিনজন সাংবাদিক ছিলেন বলেও জানান তিনি।
বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বলেন, "বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ নিজেদের ইচ্ছায় বিয়ে করতে পারেন। আন্তঃধর্মীয় বিয়ের ক্ষেত্রে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ধর্মান্তরের বিষয়টি সম্পন্ন করা উচিত। তবে ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ না করলে বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সৃষ্টি না হলে কাউকে স্বাভাবিকভাবে বিরক্ত করার সুযোগ নেই। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।"
